Friday, 17 May 2013

ইংরেজ পেত্নী



সাউথ ওয়েলস এর কার্ডিফ শহর থেকে প্রায় চল্লিশ মাইল উত্তরে নিভৃত কিন্তু বেশ নামি ও বনেদি আবারগাভানি এলাকায় একটা রেস্টুরেন্টে কাজ করতে এসেছি ২/৩ দিন আগে। জায়গাটা বেশ সুন্দর, পিছনে পাহাড় সামনে কার্ডিফ থেকে আসা রাস্তা চলে গেছে দুই মাইল দূরের আবারগাভানি শহর কেন্দ্রে আবার ওখান থেকে ওই রাস্তা দিয়ে হেরিফোর্ড যাওয়া যায়। উত্তরেও একটা আভ্যন্তরীণ রাস্তা।

বেশ পুরনো রেস্টুরেন্টটা দোতলা। নিচতলায় বার, ওয়েটিং লাউঞ্জ, টয়লেট আর হলরুম। উপরে খাবার টেবিল আর ছোট্ট একটু বার মানে উপরে যারা খাবার খেতে আসে তাদের ড্রিংকস দেয়ার জন্য আর বারএর পিছনে টয়লেট।  একদিন দুপুরে লাগাড়ের পাইপ লাইন পরিষ্কার করতে হবে বলে পুরনো যারা আছে তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম লাগাড়ের ব্যারেল কোথায়? এমরান বলল নিচতলার বারের পিছনে নিচের সেলারে। সেলার হলো চাষ বাস কিংবা বাগানের যন্ত্রপাতি কিংবা যার যা প্রয়োজন তেমন ধরনের মালামাল রাখার জন্য আন্ডারগ্রাউন্ডের স্টোর। বাইরের দিকে একটা ম্যান হোলের মত দরজা আছে যার চাবি বিয়ার সাপলাইয়ার এবং লন্ড্রির ড্রাইভারের কাছেও একটা করে থাকে যাতে করে তারা তাদের সুবিধা মত সময়ে এসে পুরনো খালি ড্রাম বা ময়লা কাপড়ের বান্ডিল নিয়ে যেতে এবং নতুন ভর্তি ড্রাম, মদের অন্যান্য কার্টুন এবং ধোয়া কাপড় রেখে যেতে পারে। 
খুঁজে দেখলাম পাশেই সেলার রুমের সুইচ। সবগুলি সুইচ অন করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলাম।, ওরে বাবা এত ঠাণ্ডা! তাড়াতাড়ি পাইপ ওয়াশ করার ব্যবস্থা করে কানেকশন দিয়ে উপরে উঠবো এমন সময় পাশে একটা বন্ধ দরজায় চোখ পড়ে গেল। দেখলাম দরজাটা সিটকিনি এঁটে বন্ধ এবং একটা হ্যাচবোল্ট লাগিয়ে তালা দেয়া এবং তার পরেও দুইটা লম্বা কাঠের বাতা দিয়ে আড়াআড়ি করে তারকাটা দিয়ে ভাল করে আটকান। মনে একটু প্রশ্ন এলো এই দরজা বন্ধ করার জন্য এত ব্যবস্থা কেন? সাধারণ সিটকিনি হলেই যেখানে হয়ে যায় সেখানে এই ত্রিমুখী ব্যবস্থা কেন? না, আমি কাউকে কিছু না জানিয়ে ওটা খোলার কোন ইচ্ছা পোষণ করিনি। তা  ছাড়া ওটা খোলার মত চাবি বা আনুষঙ্গিক কোন যন্ত্রপাতিও আমার কাছে নেই তার পরে এত সময়ও নেই হাতে। শুধু মাত্র একটু কৌতূহল নিয়েই উপরে উঠে এলাম। দুইটা বাজার আগে বিয়ারের লাইন পরিষ্কার করতে হবে। উপরে এসে লাইন চালু করে দিলাম আর গত এক সপ্তাহের যত গাদ জমেছিল তা একটু একটু করে ক্যামিকেল মেশান পানির সাথে পাইপ দিয়ে সিংকে বেরিয়ে যাচ্ছে। ক্যামিকেল দিয়ে ধোয়া হলে পরে আবার  সাদা পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। কার্লসবার্গ, সাইডার, কোবরা এবং ফস্টারের মোট চারটা লাইনে পরিষ্কার করতে অন্তত দেড় ঘণ্টা লেগে যাবে। ডান দিকে কুট করে একটু শব্দ হলো দেখি এমরান টেবিল সেট করছে।
এই এমরান শুনছ?
বলেন দাদা
আচ্ছা সেলারে ওই দরজাটা এত যত্ন করে বন্ধ কেন?
কি জানি আমি কাউকে জিজ্ঞেস করিনি
কেন?
কি দরকার দাদা? কাজ করতে এসেছি কয়দিন থাকব আবার চলে যাব কাজেই কোন দরজা বন্ধ আর কোন দরজা খোলা তাতে আমার কি আসে যায়? তাই কিছু জানতে চাইনি।
ঠিক বলেছ এমরান
ব্যাস এই পর্যন্তই রইল এ প্রসঙ্গে।
একদিন আমার ছুটি ছিল। সারা দিন আবারগাভানি শহরের লাইবেরি, বাজারর এ জাগায় ও জাগায় টো টো করে ঘুরেছি বাইরেই দুপুরে ইংলিশ লাঞ্চ করেছি। সারাদিন বাইরেই চা খেয়েছি। এদেশে সন্ধ্যার পরে এইরকম ছোট শহরে সব কিছু বন্ধ হয়ে যায় তাই বেশি দেরি করিনি। তবুও ফেরার পথে আস্ক নদীর উপর দিয়ে ব্রিজটা পার হয়ে এসে এপারে ড্যাফোডিলের ঝোপের ধারে অনেকক্ষণ নদীর দিকে মুখ করে বসেছিলাম। রেস্টুরেন্ট বন্ধ হবে রাত এগারটায়। এখন গিয়ে কি করব, তাই যতক্ষণ থাকা যায় বসে থাকব ভাবছিলাম। বসে বসে ঢাকায় ফোন করলাম কয়েকটা। তারপরে যখন শীত বেড়ে গেল তখন উঠে এসে রেস্টুরেন্টের পিছন দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে কাপড় বদলে নিজের বিছানায় শুয়ে পরলাম। ঘুমিয়ে পরলাম। যখন ঘুম ভাংল উঠে টয়লেটে যাব আর ক্ষুধা লেগেছিল বলে কিছু খেতেও হবে ভাবলাম। এখানে সাধারণত এগারটা বারটা বেজে যায় কাস্টমর সবাই চলে যেতে। তারপরে ধোয়া মুছা, গুছানর কাজ শেষ করে খেয়ে দেয়ে বিছানায় যেতে যেতে প্রায় দুইটা আড়াইটা বেজে যায়।
কর্মচারীদের টয়লেট আর উপরের কাস্টমারদের একই টয়লেট বলে উপরের রেস্টুরেন্টে ঢুকতে হবে। নিজেদের রুম ছেড়ে যেই রেস্টুরেন্টে ঢুকেছি তখন ভিতরের সব বাতি নেভান হলেও বাইরের লাইট পোস্ট থেকে বেশ যথেষ্ট আলো আসছিল আর তাতেই দেখলাম কে একজন একটু মোটা মহিলা আমার আগে আগে টয়লেটের প্যাসেজ ধরে যাচ্ছে। ভাবলাম হয়ত কোন কাস্টমর এখনও রয়ে গেছে! সে বের হলে আমি টয়লেটে যাব। একটা চেয়ার টেনে বসলাম। হটাত মনে হলো কাস্টমর রয়ে গেছে তাহলে আমাদের লোকজন কেউ নেই কেন? এদিক ওদিক তাকালাম কিন্তু না কেউ কোথাও নেও। ও তাহলে আমি ভুল দেখেছি। উঠে টয়লেটে যাতে চাইলাম কিন্তু সেই প্যাসেজের মাথায় টয়লেটের দরজা দিয়ে আবার কে যেন ভিতরে ঢুকল তার সম্পূর্ণটা দেখিনি তবে কাপড়ের কিছু অংশ দেখেছি। আবার দাঁড়ালাম কিছুক্ষণ। কিন্তু এবারও সেই একই ধরন কেউ বের হচ্ছে না বা ভিতর থেকে কোন শব্দ হচ্ছে না এবং কোন বাতিও জ্বলছে না। এগিয়ে গেলাম, টয়লেটের বাতি জ্বালালাম। টয়লেটের কাজ সেরে কিচেনে এসে মাইক্রোওয়েভে ভাত আর একটু ভেড়ার মাংস গরম করে খেয়ে কিচেনে বসেই একটা বিড়ি বানিয়ে টেনে আবার এসে শুয়ে পড়লাম। কিছুই অস্বাভাবিক মনে হয়নি। যা দেখেছি নিজের চোখের ধা ধা মনে করে উড়িয়ে দিলাম। কাউকে কিছুই বলিনি বা বলার মত কোন ঘটনা বলে মনেও করিনি।
এই ঘটনার প্রায় সপ্তাহ দুয়েক পরে একদিন আমি বারে ছিলাম আর কোন একটা বিয়ার শেষ হয়ে গেলে চট করে নিচে সেলারে যাবার জন্য নিচের বার এর পিছনে গিয়ে সেলারের সবগুলি সুইচ অন করে যেই নিচের দিকে তাকিয়েছি সিঁড়িতে পা দেবার আগে দেখলাম কে যেন একজন সেই দিনের মত মোটা মহিলা সাদা স্কার্ট আর সাদা ব্লাউজ গায়ে নিচে নেমে গেল আমি পিছন থেকে এক্সকিউজ মি এক্সকিউজ মি, টয়লেট এদিকে নয় বলে নিচে নেমে দেখি কেউ নেই! লাগাড়ের পাইপ খালি ড্রাম থেকে নতুন ড্রামে বদলিয়ে উপরে উঠে এলাম।
এদিনও নিজের চোখের ভুল মনে করলাম। তারা হুরর মধ্যে কি দেখতে কি দেখে ফেলেছি এ কথা কাউকে বললে নিঃসন্দেহে কিছু বাক্য শুনতে হবে বলে চেপে গেলাম। এইযে দুই দিন দেখলাম এর মধ্যে কোনদিন কোন চেহারা দেখিনি শুধু পোশাক দেখেছি মাত্র কাজেই বিষয়টা নিয়ে আমিও আর তেমন ভাবলাম না।
পরদিন শুনলাম নাজমুল নামের কিচেনের এক জন এখানে কাজ করবে না বলে মালিককে ফোনে জানিয়ে দিল। তা এ দেশে কে কোথায় কাজ করবে বা না করবে সে সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যাপার এ নিয়ে কারো কোন মাথা ব্যথা নেই। তাই কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। কিন্তু দুপুরে খাবার পর একটু শুয়েছি তখন এমরান বলল
দাদা জানেন কিছু?
কি জানব?
নাজমুল কেন যাচ্ছে?
না ভাই আমাকে কেউ কিছু বলেনি আমিও কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করিনি!
রেস্টুরেন্টে ভুত আছে এবং নাজমুল তাই দেখেছে সেইজন্যে চলে যাচ্ছে, এখানে নাকি কোন স্টাফ বেশী দিন থাকতে পারে না এ জন্যে
বল কি!
তাই শুনলাম
কে বলল?
আগে এক ম্যনাজার ছিল তার সাথে আমার আলাপ পরিচয় আছে সেই বলল আজ একটু আগে
বল কি! তখন আমার দুই দিনের অভিজ্ঞতার কথা বললাম
এমরান বিশ্বাস করল
এমরানের কথা শুনে আমিও আবার ভাবনায় পড়ে গেলাম। নাজমুলের অনেক চেনাজানা আছে সে কোথাও না কোথাও কাজ পেয়ে যাবে কিন্তু আমার যে সে অবস্থা নেই!
দিন যায়, সপ্তাহ যায় মাসও যায়
মালিক বেতনটা দিয়ে দেয় রবিবারে, নিয়মটা বেশ ভাল। দেখতে দেখতে ছয় মাস হয়ে গেল কিন্তু এর মধ্যে সেই মোটা মহিলার আর কোন দেখা নেই। ভাবলাম তার সাথে দেখা না হওয়াই ভাল। এমনি হটাত করে একদিন ওই সেলারের বন্ধ ঘরের কথা মনে হলো আর সাথে সাথেই এমরানকে বললাম আচ্ছা এমরান ওই নিচে সেলারের যে দরজাটা বন্ধ ওই ঘরের সাথে কি এসবের কোন যোগসূত্র আছে?
কি জানি সে কথা আমি জানি না তবে থাকতেও পারে, আশ্চর্যের কিছু নেই।
যেদিন এই সব আলাপ হলো সেই দিন রাতে রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে কাজ সেরে সবাই রুমে চলে গেছে আমি টয়লেটে যাব। দেখলাম টয়লেট ভিতর থেকে বন্ধ কিন্তু ভিতরে লাইট জ্বলছে না। দরজার উপরে একটু কাচের দেয়াল আছে ভিতরের আলো ওখান দিয়ে দেখা যায়। আশ্চর্য ব্যাপার। ভিতরে এসে একটু বসে থেকে আবার একটু পরে দরজা ধরে ধাক্কা দিতেই ওটা খুলে গেল।
শুক্র শনি বারে বেশী ভিড় হয় বলে দুই দিনের জন্য বিকেলে অতিরিক্ত দুইজন মানুষ আসে। এর কয়েকদিন পরে শুক্রবারে রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে কাজের পরে সবাই এক সাথে রাতের খাবার খেয়েছি। এর মধ্যে ওই যে যে দুইজন এসেছে তাদের একজন নাদির কি জন্যে যেন সিঁড়ি দিয়ে নিচে যাচ্ছে।  আমি দেখেছি ওকে নিচে যেতে। 
সবার খাওয়া দাওয়া হয়ে গেল এবার যারা কার্ডিফ থেকে এসেছিল তাদের মধ্যে লতিফের গাড়ি আছে এবং সে নাদিরকে খুঁজছে। এই নাদির চল বাসায় যাই কিন্তু কোথায় নাদির! নাদির উপরে কোথাও নেই। আমি বললাম আমি একটু আগে নাদিরকে নিচে যেতে দেখেছি। লতিফ উঠে নিচের সিঁড়ির কাছে দাড়িয়ে বলল ও দাদা নিচে দেখি অন্ধকার! ঠিক আছে লাইট জ্বালিয়ে দেখ। লাইট জ্বালিয়ে দেখা গেল কোথাও নাদির নেই। টয়লেট, বার কোথাও নেই। কি জানি হয়ত আবার উপরে উঠে এসেছে আমি দেখিনি! উপরের সমস্ত জায়গায় খুঁজে দেখা হলো! কিন্তু না, কোথাও নেই! কি হতে পারে? সবারই এক প্রশ্ন! রেস্টুরেন্টের মালিককে ফোন করা হলো। কুদ্দুস ভাই, নাদিরকে পাওয়া যাচ্ছে না! কুদ্দুস ভাই দূর থেকে আর কি সমাধান দিতে পারে? সব জায়গায় খোজা হয়েছে কেবল নিচের ঐ সেলার বাকী রয়েছে। চলেন সেলারটা দেখে এসে পুলিশকে জানাতে হবে। হ্যাঁ চলো দেখি সেলারটা দেখে আসি। কয়েকজন মিলে সেলারে নেমে দেখে ওই বন্ধ দরজার পাশে লন্ড্রির কাপড়ের উপরে শুয়ে নাদির নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে! সবাই এই দৃশ্য দেখে অবাক! এমন হলো কি করে? নাদিরকে ডেকে ডেকে জাগান হলো। মনে হলো অনেকক্ষণ পরে ঘুম থেকে জাগল। কি ব্যাপার নাদির তুমি এখানে শুয়েছিলে কেন? নাদিরও জেগে উঠে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চারিদিকে তাকিয়ে দেখে কি ব্যাপার আমি এখানে কেন আর আপনারাই বা এমন করছেন কেন? সে প্রশ্ন তো আমাদেরও! কি হয়েছিল বল। তুমি খেয়ে দেয়ে নিচে গিয়েছিলে আমি দেখেছি তারপরে কি হলো তাই বল। আমার কিছুই মনে পরছে না! কিন্তু আমি এখানে কেন? এই প্রশ্নের কোন উত্তর পাওয়া গেল না। তবুও কাছের পুলিশ স্টেশনে ফোন করা হলে ওরা দুইজন আসল এবং সব কিছু লিখে নিলো। কারো কিছু ক্ষতি হয়েছে কিনা বারবার জানতে চাইল। না কারো কোন ক্ষতি হয়নি। লতিফ নাদিরকে নিয়ে রাত দুইটায় কার্ডিফ চলে গেল।
পরদিন কুদ্দুস ভাই আসল তার একটু পরে দুইজন পুলিশ আসল। কাল রাতে যে দুই জন এসেছিল তারা নয় এরা একটু বয়স্ক। ওরাই বলল যে এই বাড়ির নিচের সেলারে একটা রুম কি সিল করা আছে? হ্যাঁ আছে! বেশ ভাল। ১৯৬০ সালে ওখানে একজন মহিলা নিজের মাথায় গুলি করে সুইসাইড করেছিল এবং তার পরে তার আত্মা অনেকদিন পর্যন্ত এখানেই ঘোরাঘুরি করত বলে ওই দরজাটা কাউন্সিল থেকে সিল করে দেয়া হয়েছিল। এই পুরো বাড়িটা ১৯২০  সালে যখন তৈরি হয় তখন থেকেই এটা সম্ভ্রান্ত পাব ছিল এবং ১৯৫৫ সাল থেকে ওই মহিলা এখানে গান গাইত আর তার সাথে যে অর্কেস্ট্রা বাজাত ওই ছেলেটার সাথে ওর প্রেম ছিল কিন্তু কেন যে মেয়েটা সুইসাইড করল কেউ বলতে পারেনি, আজও অজানা।
এই ঘটনা জানার পর আমি ওখানে আর বেশি দিন থাকিনি, স্কটল্যান্ড চলে গিয়েছিলাম।

No comments:

Post a Comment

Thank you very much for your comments.