Sunday, 23 December 2012

নক্ষত্রের গোধূলি-৭০ [অধ্যায়-৭]

বাড়িতে যোগাযোগ যা করার তা সবই প্রায় মেইলের মাধ্যমেই করে শুধু নিয়ম করে সপ্তাহে এক দিন ছুটির দিনে ফোন করে। মেইল যাই হোক তাতে কথা শোনা যায় না, মনির বা তার মেয়েদের কণ্ঠের উষ্ণ অনুভূতি গুলি শুনতে পায় না। কেমন যেন শূন্য শূন্য মনে হয়। মন ভরে না। আবার এদিকে ফোন করতে অতিরিক্ত খরচ হয়ে যায়। সে দিকেও লক্ষ্য রাখতে হয়। এমন কীইবা বেতন পায়। সবে কয়েক মাস হল এসেছে। অন্তত এক বছর
না হলে বেতন এর চেয়ে তেমন কিছু বাড়বে না। ফোন করেই যদি সব খরচ করে ফেলে তা হলে কি আর চলে? রাশেদ সাহেব সে কথা ভালই জানে। মনিও তাই মেনে নিয়েছে।

নাসিরের ভিসার মেয়াদ শেষ হতে চলেছে আর মাত্র কয়েক দিন বাকী। দেশ থেকেই টিকেট নিয়ে এসেছে। রিটার্ন টিকেট। রেস্টুরেন্টে নোটিশ দিয়েছে। আগামী ২৩ তারিখে ফ্লাইট। রাশেদ সাহেবের মনে একটা ঢেউ বিস্তারিত হচ্ছে। এক জন সাথি ছিল, সুখ দুঃখ ভাগ করা যেত। মনটা কিছুটা হলেও হালকা হত। নানা রকম বুদ্ধি পরামর্শ দিত। দিনের অধিকাংশ সময় এক সাথেই কাটত। কোথাও যেতে হলেও এক সাথে যেত। এখন? কে তাকে সান্ত্বনা দিবে? কে এমন আপন ছায়ায় ঢেকে রাখবে? কোথায় পাবে এমন আপন জন?
এত গুলি প্রশ্নের ভারে রাশেদ সাহেব অস্থির। নাসির কিছু বুঝতে পেরে যতটা সম্ভব সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে। এক দিন বলল
রাশেদ ভাই, দেশে ভাবী বাচ্চাদের জন্য কিছু কিনে দেন আমি নিয়ে যাই। আমার কোন শপিং নেই। আপনার যতটা ইচ্ছা দিয়ে দিন। আমি নিজে যেয়ে ভাবীর হাতে দিয়ে আসব। ভাবীকে যতটা পারি সান্ত্বনা দিয়ে বুঝিয়ে আসব।
হ্যাঁ তাইতো!
সেই দিনই দুপুরের ডিউটি সেরে দুই জনে এক সাথে কাছের সুপার স্টোর টেসকোতে গেল। গত কাল বেতন পেয়েছিল বলে পকেটে রানীর মাথার ছবি আকা পাউন্ডের নোট গুলি ছিল। সারা স্টোর ঘুরে যা যা ইচ্ছা হল, দুই চোখে যা যা ভাল লাগল এটা  আমার খুকুর জন্য, এটা আমার মাঝুর জন্য, এটা আমার ছোটনের জন্য আর এটা আমার মনির জন্য। তিন মেয়ে আর মনির জন্য কিনে আনল। নাসির সাথেই ছিল। সব দেখল কোন বাঁধা দিল না। মানুষটাকে বেঁচে থাকতে হবে। যা ইচ্ছা তাই করুক। এক দিন তাকে আবার দেশে তার স্ত্রী সন্তানদের কাছে ফিরে যেতে হবে, এত দিন তাকে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে হবে। এই কয়েক দিনেই নাসির এই আত্ম ভোলা মানুষটাকে একান্ত কাছে থেকে দেখে চিনে ফেলেছে। এমন সহজ সরল সুন্দর মনের মানুষ তার চোখে খুব কমই পরেছে। সে নিজেও পৃথিবীর অনেক দেশ দেখেছে। ঢাকায় ব্যবসা করে, মানুষ কম দেখেনি। মাঝে মাঝে রাশেদ সাহেবেকে দেখে অবাক হয়। করুক তার যা ইচ্ছা তাই করুক। এতেই যদি সে বেঁচে থাকার কিছুটা শক্তি খুঁজে পায় তাহলে তাই হোক। এক দিন নাসিরের যাবার দিন এসে হাজির হল। রাশেদ সাহেব নাসিরকে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখের পানি সামলাতে পারলেন না। বললেন
এখানে যা দেখে গেলে ঢাকায় এসব কিছু বলতে যেয়ো না।
ভাবী জানতে চাইলে কি বলব?
একটা কিছু বলে দিও।
তাতে কার কি মঙ্গল? এর চেয়ে সত্য জানাই কি ভাল হয় না?
ঠিক আছে তোমার যা খুশী তাই বলে দিও, আমাকে আর জিজ্ঞেস করছ কেন?
চিন্তা করবেন না। ছয় মাসের মধ্যেই আমি আবার আসব, তখন এখানেই আসব এবং আপনার সাথেই থাকব। আপনি ওদের সাথে সে ভাবে ব্যবস্থা করে রাখবেন।
তাই?
হ্যাঁ।
বেশ, খুব ভাল হবে, আমি তোমার অপেক্ষায় থাকব।
মন খারাপ করবেন না। যেভাবে চলছেন এই ভাবেই চলবেন। আমি আসছি, আবার দেখা হবে।
আগেই হিথরো গামী কোচের টিকেট করা ছিল। রাশেদ সাহেব নাসিরের পথে খাবার জন্য কয়েকটা স্যান্ডউইচ বানিয়ে রেখেছিল, সে ব্যাগটা হাতে নিয়ে দুই জনে এক সাথে বের হয়ে হেঁটে কোচ স্টেশনে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সোয়ানসী থেকে কোচ এসে স্টেশনে দাঁড়াল। অন্য কোন যাত্রী ছিল না। নাসির একাই ছিল। লাগেজটা নিচে বক্সের ভিতর দিয়ে হাত বাড়িয়ে বলল খোদা হাফেজ।
রাশেদ সাহেব স্যান্ডউইচের ব্যাগটা হাতে দিয়ে বলল
খোদা হাফেজ।
ন্যাশনাল এক্সপ্রেসের কোচটা নাসিরকে নিয়ে ছুটে চলল লন্ডন হিথরো এয়ারপোর্টের দিকে।
এমনি করেই দিন কেটে যায়। সপ্তাহ, মাস এমনকি মনের মধ্যে যত ঝড় জমা আছে তার সব কিছু যেমন ছিল তেমন রেখেই দিন চলে যায় তার আপন ঠিকানায়।

৭ম অধ্যায় সমাপ্ত।

No comments:

Post a Comment

Thank you very much for your comments.