Monday, 17 December 2012

নক্ষত্রের গোধূলি- ৬৫ [অধ্যায়-৭]

 নাসির আসাতে কথা বলার মানুষ পেয়েছেন, বাহাদুরের সাথেও কথা বলেছে গল্প করেছে তখনো ভালই সময় কেটেছে।  রাশেদ সাহেব বাচাল নন তবে কথা না বলে থাকতে পারেন না।  অফিসে যখন চাকরি করেছেন তখনো চারিপাশে অনেক লোক জন নিয়ে থাকতে হয়েছে। চাকরি ছেড়ে এসে যখন ব্যবসা করেছেন তখনো লোকজনের
সাথেই থাকতে হয়েছে বলে একা একা চুপ চাপ থাকতে পারেন না। মানুষের ভিতরের দুঃখ গুলি যখন বেড়ে উঠে সীমা ছাড়িয়ে যায়, বুকের ভিতর দুঃখের জন্য বরাদ্দ করা স্থান ভড়ে যায় তখন সেখানে আবার কোন নতুন দুঃখ কষ্ট যা আসে সেগুলি সহ আস্তে আস্তে চাপ বাধতে থাকে। চাপতে চাপতে যখন আর চাপার জায়গা পায় না, ভিতরে কোন ফাঁক পায় না তখন ক্রমে জমে উঠা পাহারের সমান সব দুঃখ কষ্ট গুলি এক সাথে দুর্বার গতিতে সব কিছু ভেঙ্গে চূড়ে ঘটে বিস্ফোরণ। কথা বলে বলে যদি কিছু চাপ কমানো যায়, কিছু ভার কমানো যায়, কিছু বোঝা কমানো যায়। তাই কথা বলতে পারা, কথা বলে বলে ওগুলিকে বের করে দেয়ার একটা উপায়। না হলে এতো চাপ সইতে না পেরে বাক রুদ্ধ হয়ে যায়। কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলে।  ঘুম থেকে উঠার পর থেকে ঘুমাতে যাবার আগ পর্যন্ত নাসির আর রাশেদ সাহেব এক সাথেই থাকেন, এক সাথে খাওয়া দাওয়া, কাজ কর্ম, লাইব্রেরিতে যাওয়া, বাইরে বেড়ানো সর্বক্ষণ এক সাথেই। নাসিরের অফের দিন ফরহাদ ভাইয়ের ওখানে গিয়েছিল, অনেকক্ষণ গল্প করে এসেছে। এসে বলল
আপনাকেও যেতে বলেছে, যাবেন দেখবেন ভাল লাগবে। আপনি সাথে থাকাতে আমারতো মনেই হয় না যে আমি ঢাকার বাইরে আছি।

আমিওতো তাই, নাসির তুমি বিশ্বাস করবে কিনা তুমি এখানে আসাতে আমি যে কত সুখে আছি তা তোমাকে বুঝাতে পারবোনা।
না রাশেদ ভা, আমি বুঝি, আপনাকে সেদিন যখন জব সেন্টারে দেখেছিলাম সেই চেহারা আর আজকের এই চেহাড়ার অনেক পার্থক্য, আমার কাছে ধরা পরেছে, আমি বুঝতে পারি।
বাহাদুরের জায়গায় এসেছে সবুজ।
সবুজও ঢাকার মানুষ। ফরহাদ সাহেবের সাথেও বেশ জমে উঠেছে। নাসিরের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে তাকে যেতে হবে। নাসির ফিরে যাবার দিন গুনছে। রাশেদ সাহেবকে পরামর্শ দেয়,
বেশি ভাববেন না, চিন্তা করবেন না ফরহাদ ভাই রয়েছে সময় কেটে যাবে। সব সময় হাসি খুশি থাকার চেষ্টা করবেন। দেখি, হয়তো আমি দুই তিন মাস পর আবার আসতে পারি। যদি আসা হয় তাহলে এখানেই আসব, আপনি যেখানে আছেন আপনার সাথেই থাকব।
বাহাদুর যাবার পর নাসিরের ফোনে ফোন করেছিল, কথা হয়েছে
না রাশেদ ভাই এখানে থাকা হবে না, পরিবেশ ভাল না, আপনি যা বলেছেন এখানে তাই। সমস্ত স্কটল্যান্ডেই মনে হয় একই অবস্থা, যাই হোক আমি অন্য জায়গায় কাজ খুঁজছি হলে চলে আসব। 
কি ভাবে কাজ খুঁজছেন?
কেন, জব সেন্টারে ফোন করে।

ও এভাবেও কাজ খোজা যায়?
হ্যাঁ অনেকেই এভাবেই খোজে।
আচ্ছা শিখে রাখলাম, বাহাদুর ভাই, আমি একটা ফোন নিয়েছি নম্বরটা লিখে নেন।
লিখতে হবেনা আপনি একটা কল দেন তাতেই নম্বর এসে যাবে আমি শেভ করে রাখব।
আচ্ছা দিচ্ছি। তবে ভাই যেখানেই যান যোগাযোগ রাখবেন আপনার তো ফ্রি ফোন।
হ্যাঁ আমিই ফোন করব এবং আপনার সাথে সব সময় যোগাযোগ থাকবে, চিন্তা করবেন না।
এদিকে আবার নাসিরের যাবার সময় হয়ে গেছে ও চলে যাবে।
যাক, ফরহাদ ভাই আছে না?
আপনি তার সাথে চলবেন উনি তো ভাল লোক।
হ্যাঁ তাই করতে হবে। 
আচ্ছা তাহলে আজ রাখি ভাই, নাসিরকে বলবেন।

ভারতীয় রেস্টুরেন্ট। হ্যাঁ ভারতীয়ই বললাম কারণ যখন এই রেস্টুরেন্টের গোঁড়া পত্তন হয়, যখন এই সব রেস্টুরেন্টে ভারতীয় নাবিক থেকে শুরু করে ভারতে জবর দখল করে শাসন থেকে শোষণ কাজে নিয়োজিত যে সব ইংরেজরা ভারতে গিয়ে মশলা যুক্ত খাবারের ঘ্রাণ ও স্বাদ পেয়ে নিজ দেশে ফিরে এসেও ওই খাবারের লোভে এই রেস্টুরেন্টে খেতে আসত তখন ওই দেশের নাম ছিল ভারত। তারা ওই দেশটাকে তিন ভাগ করে দিয়ে এলেও তাদের বর্তমান বংশধর অনেকেই তা জানে না। তারা এখনো ভারত বলেই জানে। তাদের এসব ইতিহাস জানার দরকার নেই, চেষ্টাও নেই বা ইচ্ছেও নেই। এদের দরকার সুগন্ধি মশলাদার সুস্বাদু খাবার। তা সে যে দেশেরই হোক তাতে কি এমন আসে যায়।
কবে কে এই রেস্টুরেন্ট চালু করেছে অনেক খুঁজেও আমি সে ইতিহাস সংগ্রহ করতে পারিনি। বিলাতে এই ব্যবসার সাথে জড়িত কয়েক জন প্রবীণ ব্যক্তির সাথে আলাপ করে কিছু জেনেছি, এর মধ্যে ইদ্রিস মিয়া, যিনি এসেছিলেন বর্তমান বাংলাদেশের সিলেটের মৌলভী বাজার থেকে ১৯৩৫ সালে, তার ভাতিজার থেকে পাওয়া কিছু সামান্য তথ্য এখানে দিচ্ছি। ১৯০০ সালের প্রথম দিকে ভারতীয় নাবিক বা অন্য কাজের জন্য যারা বিলাতে এসেছে তারা একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছে যে ইংরেজরা দেশ দখল করার কৌশল জানলেও রান্নার কাজে এরা খুবই দুর্বল। বিশেষ করে আমাদের নুন মশলার ঝাল খাবার ক্রমেই এদের কাছে জন প্রিয় হয়ে উঠছে। হবে না কেন, এরা যা খায় তাকে আর কিছু বলা গেলেও রান্না বলা যায় না। কোন রকম একটু সেদ্ধ করে লবণ, গোল মরিচের গুড়া আর একটু টমাটো সস ছিটিয়ে খেয়ে নিচ্ছে। এই মুখে যদি একটু মশলা ছিটিয়ে দেয়া যায় তাহলে যেন ধন্য হয়ে যায় এমন একটা ভাব।

লন্ডন, বৃস্টল, লিভারপুল, ডান্ডি এই সব বিভিন্ন বন্দরে কিছু ভারতীয় নাবিক আসা যাওয়া করতে করতে তাদের কেউ কেউ সমুদ্রের নোনা জলের মায়া কাটিয়ে এখানেই থেকে যায়। এরা যেহেতু দেশ থেকে বিয়ে শাদী করে বৌ নিয়ে আসেনি কাজেই এখানেইসাদা চামড়ার পাত্রী খুঁজে বিয়ে করে স্থায়ী ভাবে ঘর সংসার পেতে বসেছিল। নাবিকের পেশা ছেড়ে দিয়েছে এখন সংসার চলবে কি করে? ধীরে ধীরে নানান কল কারখানায়, কয়লার খনিতে কাজ জোগাড় করে নেয়। ইংরেজ বৌর সাথে সেদ্ধ বা আধা সেদ্ধ খেয়ে কোন মতে দিন যায়। কিন্তু ভারতীয়দের কি আর এই খাবারে মন ভরে? তাই যে সব জাহাজ ভারতে আসা যাওয়া করে তাদের দিয়ে ওখান থেকে মশলা পাতি আনিয়ে বাড়িতে মা চাচীকে যেভাবে রান্না করতে দেখেছে  সেই ভাবে চেষ্টা করে কিছুটা হলেও মনকে প্রবোধ দিতে পেরেছে। এদিকে বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হলে অনেক কল কারখানা হুমকির মুখে পরে যায় তখন শুরু হল ছাটাই। তখন এই সব ভারতীয়দের যারা চাকুরী হারিয়েছে তারা ইতোমধ্যেই এদের রান্নার দুর্বলতা ধরে ফেলেছে। এখান থেকেই উৎপত্তি হল এক নতুন দিগন্তের উন্মেষ।
ভারতে যাতায়াত কারী জাহাজে করে এর মধ্যেই বেশ কিছু মশলা আসছে আর চিন্তা কি? খুলে ফেলল খাবার ঘর। যেখানে নাবিক সহ ওই যে ভারত ফেরত ইংরেজরা যারা এই সব মশলাদার খাবার খেয়ে অভ্যাস করে এসেছে তারা ওই স্বাদ, ওই গন্ধ ভুলতে পারেনি। ভুলবেই বা কি করে, পৃথিবীর সেরা স্বাদ এই ভারতীয় রান্না, এর কোন তুলনা নেই। সাধে আমাদের গুণীজনেরা বলেনি যে ‘ঘ্রানং অর্ধং ভোজনং” জিভে জল আসা ঘ্রাণেই অর্ধেক ভোজনের তৃপ্তি। জিহ্বাটা তীর্থের কাকার মত চেয়ে থাকে কখন এই খাবারের সংস্পর্শে আসবে।

বিলাতিদের ভারতীয় খাবারের আসক্তি এবং সাগরের মায়া কাটিয়ে এখানে যারা বসতি গড়েছে তাদের জীবীকার তাগিদ এই দুয়ে মিলে যাত্রা আরম্ভ হল ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের। প্রথম দিকে নোঙ্গর ফেলে মাটির স্পর্শ নিতে আসা কিছু নাবিক আর ভারত ফেরত কিছু বিলাতি মিলে খেতে শুর করল এই রেস্টুরেন্টে। ভারতীয় স্বামী রান্না করে আর তার বিলেতি বৌ সামনে গ্রাহকদের সেই খাবার পরিবেশন করে। সাধারণ ভাত, সামুদ্রিক ম্যাকারেল, কড বা সার্ডিন মাছ, এদেশের নদীর হেরিং, ট্রাউট মাছ, মুরগী বা ভেড়ার মাংস যা আমরা সচরাচর খেয়ে থাকি তাই দিয়েই যাত্রা। পরবর্তীতে সময়ের সাথে মানুষের চাহিদা বাড়তে শুরু হল আর সেই সুযোগে এই সব রেস্টুরেন্টে যারা রান্না করে তাদের পারদর্শিতাও বাড়তে থাকে। ক্রমে ক্রমে ভারতের নানা এলাকা যেমন বাংলা, মাদ্রাজ, গুজরাট, কেরালা, পাঞ্জাব বিভিন্ন এলাকা থেকে রন্ধন পটীয়সীরা তাদের নানা রকম ভাণ্ডার এনে চমক দেখাতে আরম্ভ করল।

No comments:

Post a Comment

Thank you very much for your comments.