Sunday, 25 November 2012

নক্ষত্রের গোধূলি-১৫ [২য় অধ্যায়]

 [ পূর্ব সূত্রঃ নক্ষত্রের গোধূলি-১৪ [২য় অধ্যায়] চোখের পলকেই যেন আবার কোথায় হারিয়ে গেল, মিলিয়ে গেল দূর দূরান্তের স্বপ্নে দেখা গভীর প্রশান্তির অতলে। সেখানে জায়গা করে নিল্ ঘন কুয়াশা ঢাকা অনিশ্চিত ভবিষ্যত। কি হবে কি হবে না তাই ভেবে রান্না ঘরের জানালা দিয়ে নারকেল গাছের মাথায় যে সিনেমা দেখেছিল সেই কথা মনে এসে ভীড় করলো আবার।]


লন্ডন যাবার প্রস্তুতি শেষ। নেহায়েত যা একান্ত দরকার তাই কেনা কাটা করা বা পাসপোর্টে পাউন্ড এন্ডোর্স করা সবই করে ফেলেছে। যাবার দুদিন আগে যাতে কোথাও বের হতে না হয়। আজ মেয়েরা কেউ স্কুল কলেজে যায়নি। মেয়েরা সবাই উঠে নাশতা সেরে বাবা মাকে নিয়ে বসল। এ গল্প সে গল্প, আশা আকাঙ্ক্ষা কত কি এলো মেলো কথা হোল। আড্ডা জমে উঠে এতো দিনের গুমোট বাধা ভাবটা কেটে গিয়ে যেন বাড়িটা আবার প্রান চঞ্চলে ভরে উঠলো। বাড়িটা হাসি খুশিতে ভরে গেল। মেয়েরা সবাই বায়না ধরল মা আজ খিচুড়ি রান্না কর, বাবা পছন্দ করে সবাই মিলে এক সাথে খাব। বড় মেয়ে বললো না মা তুমি থাক আজ আমি রান্না করি।

দুপুরে ডিম ভাজি দিয়ে খিচুড়ি খেতে বসে মেঝ মেয়ে বললো মাংশ হলে ভাল হতো। ছোট মেয়ে বলে উঠলো যা হয়েছে তাই যথেষ্ট হয়েছে। শুনে মেঝ মেয়ে আবার বললো হ্যা তাই, ভাগ্যে থাকলে আবার হবে ইনশাল্লাহ। মেয়েদের এই সব বিচক্ষণতা দেখে রাশেদ সাহেব মনির মুখের দিকে তাকালেন, মেয়ে গুলি হয়েছে একেবারে মায়ের মত। কোন বায়না নেই, কোন চাহিদা নেই, কোন চাওয়া নেই, কোন দাবী নেই। যা পাচ্ছে তাতেই খুশী না পেলেও কোন আপসোস নেই। খাবার পর মেয়েদের নিয়ে আবার বসলেন। ওরা যাবার পর মেয়েরা কি ভাবে চলবে সে ব্যবস্থা মোটামুটি করে রেখেছিলেন।

বড় মেয়ের হাতে সব বুঝিয়ে দিয়ে বলে দিল এর পরেও যদি কিছুর প্রয়োজন হয় তাহলে মামা অর্থাৎ তোমাদের দাদাকে ফোন করে জানাবে। আমি মামাকে বলেছি, উনি দেখবেন।
ছোট মেয়ে জানতে চাইল আব্বু তোমরা এয়ারপোর্টে যাবে কি ভাবে?
আমি তো ভেবে রেখেছি আমি আর তোমার মা একটা স্কুটার নিয়ে চলে যাব। তুমি কি কিছু বলতে চাও?
মনিরা বললো তা কি করে হয়?

তাহলে কি করতে চাও?মনি একটু দ্বিধার সাথে বললো ওদের বাবা মা দুজনেই চলে যাচ্ছে ওরা যদি একটু এয়ারপোর্ট পর্যন্ত এগিয়ে বিদায় দিয়ে আসতে পারে তাহলে মনে ওদের ভাল লাগবে।
কিন্তু সে রকম গাড়ি ভাড়া করার মত টাকা কোথায়?আগে বললে হয়ত কিছু খরচ কমিয়ে ব্যবস্থা করতে পারতাম।
আচ্ছা সে আমি ব্যবস্থা করছি তুমি ভেবো না।
দেখ যদি পার কর। আমারও তো মনে হয় যাবার আগে সবার মুখে একটু হাসি দেখে যেতে পারলে ভালো লাগতো। দেখ যদি পার কর সবার হাসি মুখ দেখে যাই। আবার কবে ফিরে আসি না আসি তা কি বলা যায়?রাশেদ সাহেব কোন বাধা দিলেন না।

মনিরা তার হাতের শেষ সম্বল ভেঙ্গে সেঝ দেবরকে দিয়ে এয়ারপোর্টে যাবার জন্য একটা মাইক্রো বাস ভাড়া করে রেখেছে।
যাবার সন্ধ্যায় সব কিছু রেডি। গাড়ি এসে অপেক্ষা করছে। মনির মা, বড় বোন, ছোট বোন এসেছে। তারাও এয়ারপোর্টে যাবে। রাশেদ সাহেবের সেঝ ভাই ছোট ভাই আর মেয়েরা সবাই যাবে। মালামাল গাড়িতে তোলা হয়েছে। বাড়ি থেকে বের হবার আগে বাবাকে সালাম করে বিদায় নিতে এলেন।
আব্বা এর আগেও আমি অনেক বার এরকম যাত্রা করেছি কিন্তু সে সব যাত্রা আর আজকের এই যাত্রার মধ্যে অনেক পার্থক্য। জানি না এটাই আমার শেষ যাত্রা কিনা। ভুল ভ্রান্তি অনেক করেছি, অনেক বেয়াদবিও হয়ে গেছে মাফ করার যোগ্য মনে হলে মাফ করে দিবেন। আমি তো বাড়ি ছাড়া, দেশ ছাড়া হলাম আমার মেয়েরা রইলো।

মনে মনে ভাবলেন বাবা আপনাকে আবার দেখতে পাব কিনা জানি না। এই বলেই ভেজা চোখে বেড় হয়ে গাড়িতে উঠলেন।
এয়ারপোর্টে পৌছে সবার কাছ থেকে একে একে বিদায় নিলো। শাশুড়ি, বড় আপা, ছোট শ্যালিকা, শ্যালিকার গাল টেনে একটু রসিকতা করলেন, ছোট ভাই, সেঝ ভাই, সবার শেষে মেয়েদের কাছে। মনি মেয়েদের বোঝাচ্ছে কাদেনা মা আমি তো কদিন পরেই আসছি। মেয়েদের একে একে সবাইকে বুকে নিয়ে মন শক্ত করার কথা বলে মনিকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে গেলেন।
এয়ারলাইনসের চেক ইন কাউন্টারে এসেই কায়সার বেয়াইর সাথে দেখা।
আরে বেয়াই আপনি এখানে?
লন্ডন যাচ্ছি। আপনারা?
আমরাও তো ওখানেই যাচ্ছি।
যাক ভালোই হল।

[আবার দেখা হবে যখন আকাশে উঠবে একাদশীর চাঁদ, তেমনি কোন তারা ভরা রাতে। এ পর্যন্ত সুস্থ থাকুন, ভাল থাকুন আর সুখ স্বপ্নে মগ্ন হয়ে রাশেদ সাহেবের সাথে দেখা করার জন্য পরবর্তী পর্বের অপেক্ষা করুন। ধন্যবাদ]

No comments:

Post a Comment

Thank you very much for your comments.