Thursday, 29 November 2012

নক্ষত্রের গোধূলি-২৫ [২য় অধ্যায়]

[পূর্ব সূত্র; নক্ষত্রের গোধূলি-২৪, মনিরা বলল ভাই এবার আমার যবার ব্যবস্থা ঠিক করে দেন। ফিরোজ টেলিফোনে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনের অফিসে কথা বলে নভেম্বরের সাত তারিখে সকালে মনিরার যাবার দিন ঠিক করে নিল।]


কায়সার বেয়াইর সাথে ফোনে আলাপ হল।
আরে বেয়াই আমিও তো ওই ফ্লাইটে কনফার্ম করেছি।
তাহলেতো ভালই হয়েছে।
আজ চার তারিখ, মনিরা যাচ্ছে সাত তারিখে। মাঝে আর মাত্র দুই দিন। এই দুই দিন ওরা আর কোথাও বের হয়নি। রাশেদ সাহেব যেতে চাইলেও মনিরা ধার করে আনা টাকা এ ভাবে খরচের ভয়ে এড়িয়ে গেল। রাশেদকে বোঝাবার চেষ্টা করল
তুমি বোঝ না কেন, এইতো শেষ নয় তুমি রোজগার কর তারপর এসে বেড়াতে পারব। তখন মনে আর কোন কাটা বিধবে না।
একথা শুনে রাশেদ আর কিছু বলতে পারেনি, যুক্তি সঠিক। আর কিই বা বলবে, বলার মত কিছু নেইও। এ দুই দিন ঘরে বসে গল্প সল্প করেই কাটিয়ে দিল।
মনিরা যাবার আগের রাতে ফিরোজ বললো
ভাবীকে নিয়ে এয়ারপোর্টে আমি যাব শেফালি যেতে পারবে না ওর ক্লাশ আছে। তুমিও লাগেজ নিয়ে এক সাথে বের হবে ওখান থেকে অক্সফোর্ডের কোচ আছে। তোমাদের নামিয়ে দিয়েই আমাকে চিজউইক আসতে হবে একটা কাজ আছে।

রাতে শোবার পর মনিরা বলল
তুমি একা একা কেমন করে থাকবে?তোমার ওষধ পত্র কি মনে করে খাবে?তুমি অত উদাস হয়ে থেকোনা লক্ষ্মি আমার, একটু সজাগ হবার চেষ্টা কর। তোমার তিনটা মেয়ে রয়েছে তাদের জন্য তোমাকে শক্ত হতে হবে। যখন খারাপ লাগবে এখানে চলে আসবে। ক’দিন পর পর ফোন করবে না হলে আমি পাগল হয়ে যাব।
আস্তে আস্তে রাশেদের কাছে আরো কাছে এসে রাশেদের বুকে মাথা রেখে নির্জীবের মত পরে রইলো। কন্ঠ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছে না। রাশেদের বুকে কেমন একটা উষন ভাব অনুভুত হলো, আবার এরকম, আবার। ক্রমেই এই অনুভুতির সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে এদিকে মনিরার শরীর কেপে কেপে উঠছে।

হাতের স্পর্শে দেখলো মনিরারা চোখের নোনা জল পরে তার বুক ভিজে গেছে শীতের পোষাক গায়ে বলে এতক্ষন বুঝতে পারেনি। তবুও রাশেদ সাহেব তার মনিকে কিছু বলতে পারেনি। মনি কাদছে, কাদুক। এতে যদি একটু হালকা হতে পারে তাতেই মঙ্গল। কান্না থামিয়ে দিলে বোঝা আরো বেশি ভারী হতে পারে এই ভয়ে কিছু বলতে পারেনি। রাশেদ সাহেবের ভিতরে একটু দুঃখ, একটা চাপা অভিমানের উদয় হলো। যে মনিকে ছাড়া রাশেদ অচল সেই মনি এই রাত পোহালেই তাকে একা বনবাসে রেখে চলে যাবে। কি যেন বলতে চাইল কিন্তু মুখ দিয়ে সামান্য একটু শব্দের মত বের হলো সেটা কোন কথার মত হলো না।

রাশেদ আবার মনির মাথা বুকে চেপে চুপ করে রইলো। মনিরা কাদছেই। সারা জীবনের জমে থাকা চোখের নোনা পানি রাশেদের বুক ভিজিয়ে দিচ্ছে।
হোক, মনি কেদে কেদে হালকা হোক। ওর দুঃখ গুলি নোনা জলে ধুয়ে যাক। মনিকে যে শক্ত হতে হবে দেশে ওদের মেয়েরা আছে তাদেরকে মায়ের স্নেহ দিতে হবে বাবার স্নেহ দিতে হবে, মানুষ করতে হবে। রাশেদ সাহেব আবার কি যেন বলতে চাইলো কিন্তু এবারও সেই একই অবস্থা, মুখ দিয়ে কথা বের হলো না।
কিছুক্ষন এভাবে থাকার পর রাশেদ ডাকলো, মনি।
হু।
কাদছ কেন?
তোমাকে রেখে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। তুমি যে ভোলা মনের মানুষ থাকবে কি করে তারপর আবার ডায়াবেটিকসের রুগী। কে তোমাকে দেখবে, আর কেই বা তোমার খাবার পথ্য যোগার করে দিবে?
না মনি, তুমি শুধু দোয়া করবে দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি কোন চিন্তা করবে না দেখবে রাতের পরেইতো দিন আসে। এক দিন দেখবে আমাদের এই দিন থাকবে না। তখন সবাই মিলে একত্রে থাকবো। আবার সেই আগের মত সব হবে। এখানে তোমার আসার ব্যবস্থা করে নিলাম যখন ইচ্ছা হবে চলে আসবে। আমি এখান থেকে টাকা পাঠাব তুমি মেয়েদের নিয়ে চলবে।

সারা জীবন ভরেতো দেখে আসছি নিজের জন্যতো কিছু ভাবতে পারনি, নিজের কিছু করতেও পার না তাই তো ভাবনা তুমি একা থাকবে কি ভাবে?
না মনি, সে জন্য ভাবনার কিছু নেই। প্রকৃতি মানুষকে অনেক কিছু দেয়, তার মধ্যে অনেক কিছুই থাকে। আমিও তেমন শক্তি পেয়ে যাব, এ তো প্রকৃতির বিধান। এতো আমরা চাইলেই পরিবর্তন করতে পারবো না। কাজেই এ জন্য তোমার ভাবনার কিছু নেই, চিন্তারও কিছু নেই। এখন একটু ঘুমাবার চেষ্টা কর, ভোরে উঠেই লম্বা যার্নি শুরু হবে। একা যেতে পারবেতো?
পারতে যে হবে।

রাশেদ সাহেব বা মনিরা কেও আর কোন কথা বলেনি তবে কারো চোখে ঘুম আসেনি। শুয়ে শুয়ে উভয়েই যার যার মত করে ভাবনার একই স্রোতে সাতরিয়ে ব্যার্থ কূলের সন্ধান করেছে। ভোড়ের ট্রেনের শব্দ পেয়ে মনি বিছানায় উঠে বসে রাশেদ সাহেবকে ডাকল। রাশেদ সাহেবতো জেগেই ছিলেন। সারা রাত নানা চিন্তা এসে মগজের অলিতে গলিতে ইচ্ছে মত ঘুড়ে বেড়িয়েছে। মনি চলে যাচ্ছে ও একা এই পথ কেমন করে পাড়ি দিবে বিশেষ করে কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে ট্রান্সফার হবে কি ভাব? সে নিজেই বা এদেশে বেয়াইনি ভাবে আর কত দিন থাকতে পারবে?ছোট ভাইয়ের বাসায় তাদের একদিনের জন্যও জায়গা হলো না, দেশ থেকে ছয় হাজার মাইল দূরে এসে এই দেখবে তা কখনো কল্পনাও করতে পারেনি।

কেন এমন হয়েছে এই ভেবেই অস্থির, কোন কূল কিনারা পায় নি। সে কি মানসিক ভারসাম্য হারাতে বসেছে?মনি চলে যাচ্ছে কে তাকে এই সান্ত্বনা দিবে?তাকে কে দে্খে রাখবে?মনিকে যতই বলুক তুমি চিন্তা করো না। আসলে যে সে নিজে কিছুই সামাল দিতে পারবে না তা সে ভাল ভাবেই জানে। সেদিন মনিকে এই কাটা ঘায়ে মলম লাগাবার কথা বললেও এই কি মন থেকে মুছে যায়?নাকি এটা মুছে যাবার ব্যাপার?আপন ছোট ভাইয়ের এই রূপ যে কোন দিন কল্পনাও করতে পারেনি। এমন কি হবার কথা ছিল?কোন জবাব খুজে পায় নি। এ আবার কি ধরনের পরীক্ষা! এ যে দেখছি চড়ম পরীক্ষা। এই পরীক্ষার আগুনে যে সে জ্বলে পুরে ছাই হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এই কয়েক দিনেই যেন তার বয়স বিশ বতসর বেড়ে গেছে।

মনি জিজ্ঞ্যেস করল সারা রাততো ঘুমাও নি, তুমি কি ওই কথা ভাবছ, ও কথা ভেবে কি হবে?আর ভেবো না। নিজেকে শক্ত কর, মন শক্ত কর। মনে কর এটা আমাদের প্রাপ্য ছিল। আজ যদি তুমি ব্যবসায় ক্ষতি না দিয়ে ভাল লাভ করে লক্ষ লক্ষ টাকা তোমার হাতে থাকত তাহলে এমন হোত না। আর ভেবো না চল রেডি হও।
দুজনেই উঠে রেডি হয়ে মালপত্র নিয়ে নিচে নেমে এলো। আজ কেউই রোজা রাখে নি। সকালের নাস্তা খেয়ে বিদায়ের পালা। মনিরা ভাবীকে জড়িয়ে ধরে বলল
ভাবী, জানিনা কোন পূণ্যের ফলে নিয়তি আমাদেরকে টেনে আপনাদের কাছে নিয়ে এসেছে। আপন হলো পর আর যাকে কোন দিন দেখিনি, যার কথা কোন দিন শুনিনি সেই হলো আপন, এই বুঝি পৃথিবীর নিয়ম।
বলেই কেদে ফেলল। সে কান্না শেফালির মধ্যেও সংক্রমিত হলো। দুজনেই কাদছে। বিদায় এমনিতেই কঠিন, বিশেষ করে যেখানে মায়ার বন্ধন থাকে। মন কিছুতেই মেনে নিতে পারে না।
তবুও যেতে হয়, চলে যায়। মনিরা ফিরোজের মায়ের কাছে গিয়ে বলল’
ফুফু আম্মা ও তো রইল, ওকে দেখবেন, মাঝে মাঝে এখা্নেই আসতে বলেছি। ওরতো কোন জায়গা রইলো না, সবই বন্ধ হয়ে গেল। ও এখানে এলে আপনি দেখবেন। ফিরোজ ভাই, আপনাকেও একই কথা বলছি। মানুষটা একে বারে শিশুর মত সরল, কিচ্ছু বোঝে না। আজ ছাব্বিশটা বছর ধরে আমি এই চালিয়ে আসছি। প্রয়োজন হলে একটু জায়গা দিবেন। আমি জানি এদেশে আপনি অন্তত মুখ ফিরিয়ে নিতে পারবেন না।

আচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে আস্তে আস্তে বের হয়ে গাড়িতে বসল। ফিরোজ গাড়ি স্টার্ট করে চলল হিথ্রো এয়ারপোর্টের দিকে। পথে রাশেদকে এখানকার দুই একটা সাবধান বাণী শোনাল। ভাবীকে বোঝাল, মন খারাপ করবেন না। রাশেদের দিনের পরিবর্তনের সাথে সাথেই সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখবেন এই ভাইই তার নিজের ভুল বুঝতে পেরে ছুটে আসবে। মনি এক হাতে স্বামীর হাত চেপে ধরে রেখেছে যেন রাশেদকে কেও কোথাও টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাই ছুটে না যায়, অন্য হাতে চোখ মুছছে।

এয়ারপোর্টে পৌছে টার্মিনালের সামনে গাড়ি দাড় করিয়ে ফিরোজ মালামাল নামিয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেল। এখানে শুধু যাত্রীকে নামিয়ে দিতে পারে কিন্তু গাড়ি বেশিক্ষন রাখা যাবে না তাই দেরি করতে পারেনি। রাশেদ সাহেব মনিকে নিয়ে এয়ারলাইনের কাউন্টারে এসে সেদিন ফিরোজের সাথে কথা হয়েছিল সে অনুযায়ী টিকেটে লন্ডন থেকে কুয়ালালামপুর আবার কুয়ালালামপুর থেকে ঢাকার কনফার্মেশন স্টিকার লাগিয়ে চেক ইন ডেস্কে চলে গেল। ওখানে মালপত্র ওজন করে বোর্ডিং কার্ড, কুয়ালালামপুরের হোটেল রিজার্ভেশন কার্ড নিয়ে সিকিউরিটি গেটের পাশে এসে দাড়ালো।
বেয়াইকে যে দেখছি না, আসেনি নাকি এসে ভিতরে চলে গেছে বুঝতে পারছি না। ভয় পেয়ো না, এখনো আসুক বা না আসুক তুমি ওয়েটিং লাউঞ্জে তাকে পাবে।

এমন সময় এক জন বাঙ্গালি ভদ্রলোক সিকিউরিটি গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকছে দেখতে পেয়ে রাশেদ সাহেব তাকে থামিয়ে আলাপ করল। আলাপে জানলো তাদের বাড়ির কাছেই তার বাসা, শুনে খুশি হয়ে বলল
তাহলে ভাই আমিতো যাচ্ছি না মনিকে দেখিয়ে বলল ইনি যাচ্ছেন সম্ভব হলে একটু লক্ষ্য রাখবেন।
ঠিক আছে ঠিক আছে এ কি আর বলে দিতে হবে, দেখব।
রাশেদের চোখ গেটের দিকে যদি বেয়াই এর মধ্যে এসে পরে।
লোকটা বলল তাহলে আপনি আসুন আমি ঢুকে পরি।
আচ্ছা ঠিক আছে।
রাশেদের হঠাত মনে হলো তার কাছে যে পাউন্ড গুলি আর অল্প কিছু বাংলাদেশি টাকা রয়েছে সেগুলি মনির কাছে দিয়ে দিতে হবে। পকেট থেকে বের করে মনির হাতে বুঝিয়ে দিল।

[আবার দেখা হবে যেদিন ঝুর ঝুর করে ঝরা স্নো মাখানো ধূসর কোন পূর্ণিমা রাতে যখন রাশেদ সাহেব তার মনিরার স্বপ্নে বিভোর হয়ে অশ্রু জলে বালিশ ভেজাবে তেমনি কোন নোনা জলে ভেজা রাতের মধ্য প্রহরে।]

No comments:

Post a Comment

Thank you very much for your comments.