Thursday, 29 November 2012

নক্ষত্রের গোধূলি-২৪ [২য় অধ্যায়]

[পূর্ব সূত্র; নক্ষত্রের গোধূলি-২৩, আবার আমি এসে আপনাদের মত এত আপন জনের সাক্ষাত পেয়েছি যে তা কোন দিন ভুলতে পারবো না। ও যদি জোড় করে নিয়ে না আসত তাহলেতো আমার আসাই হত না, এতো কিছু দেখতেও পারতাম না।]

ফিরোজ তার এই প্রিয় জায়গার বিবরন দিতে গিয়ে তার বিয়ের প্রথম দিকের অনেক কথা বলে গেল। রাতে বিছানায় শুয়ে পরেছি এমন সময় হঠাৎ মনে হলো তো সঙ্গে সঙ্গে দুজনে উঠে গাড়ি নিয়ে এখানে চলে এসেছি তবে সেটা অবশ্যই সামারে করতাম। শীতকালেতো সম্ভব না, আজ এলাম শুধু তোমাদের দেখাবার জন্য। এমনকি রাতে দুই জনে গাড়ি নিয়ে কোথায় চলে যেতাম এক নাগারে ২/৩ ঘন্টা যেয়ে আবার ফিরে আসতাম। এক বার সাউথ ওয়েলসে চলে গিয়েছিলাম। ওখানে যেয়ে দেখি অনেক রাত হয়ে গেছে, সে রাতে আর বাড়িতে ফিরিনি ওখানেই একটা হোটেলের রুম নিয়ে থেকে পরদিন দুপুরে ফিরেছিলাম।

ভাবীর কি শীত লাগছে?
হ্যা তা একটু লাগছে।
তাহলে চলুন গাড়িতে বসি, গাড়িতে হিটার চলছিল এখনো গরম আছে।
গাড়িতে বসে মনি রাশেদের কানে কানে বলল আমার ফেরার কথা ভাইকে বলে আমার টিকেট কনফার্মের ব্যবস্থা কর।
সামনের ভিউ মিররে দেখে ভাবী জিজ্ঞেস করল কি ভাবী কানে কানে কি হচ্ছে?
না, কিছু না, এই আমার ফেরার কথা বলছিলাম।

এতো তারা কিসের কয়েক দিন থাকেন তারপর দেখা যাবে। আবার কবে আসা হয় না হয় তার কি ঠিক আছে?চলেন এখন একটা পার্কে নিয়ে যাই। বলেই গাড়ি স্টার্ট দিয়ে মিনিট বিশেকের মধ্যে একটা বিশাল এলাকা নিয়ে পার্কের গেটের সামনে এসে দাড়ালো। নামটা মনে নেই তবে চারি দিকের আলো এবং পার্কের ভিতরের আলো আঁধারি মিলে মিশে কি যে এক মায়া ভরা দৃশ্য তা না দেখলে বোঝানো কঠিন ব্যাপার। এখানে পার্কের পাশে গাড়িতে বসেই ফিরোজ তাদের জীবনের কিছু ঘটনা বলল।

গাড়িতে বসেই মনি বলল ভাই আমার টিকেটতা তারাতারি কনফার্ম করে দেন। আমি যত তারাতারি যেতে পারব তত তারাতারি ও কাজ শুরু করতে পারবে। আমার জন্য এখন একটা দিনও অনেক।
ভাবী গাড়ি স্টার্ট করে বলল তাহলে এখন ফিরে যাই, নাকি আর কোথাও যাবেন, লং ওয়েতে?সেহেরীর আগে ফিরে আসব।
না ভাবী আর না যথেষ্ট হয়েছে এবার বাসায় চলুন।
বাসায় এসে ওরা উপরে গিয়ে শীতের কাপড় বদলে নিচে নেমে এসে দেখে ফিরোজ একটা বাংলা পত্রিকা নিয়ে বসে আছে।

রাশেদকে দেখে বলল দেখ এখানে রেস্টুরেন্টের কাজের অনেক বিজ্ঞ্যাপন আছে, কিছু জব সেন্টারের ঠিকানাও আছে। তুমি কাল কোন একটা জব সেন্টারে গিয়ে খোজ় নিয়ে দেখ কি বলে। এই সব জব সেন্টারে রেস্টুরেন্টের কাজের চাহিদা আসে, ওরা কোথাও প্রভাইড করে দিতে পারবে তবে ওরা একটা ফি নিবে। আমি এই ব্যবসা অনেক দিন আগে ছেড়ে দিয়েছি বলে এই লাইনের কারো সাথে যোগাযোগ নেই না হলে আমিই করে দিতে পারতাম। এখানে এই কাজই বাঙ্গালিদের জন্য সবচেয়ে ভাল। থাকা খাওয়ার কোন চিন্তা নেই, সপ্তাহ পার হলেই কিছু বেতন পেবে, সপ্তাহে এক দিন ছুটি। তোমার কোন অভিজ্ঞ্যতা নেই বলে প্রথম দিকে বেশ কম দিবে তবে আস্তে আস্তে অভিজ্ঞ্যতা বাড়বে সে সাথে বেতনও বাড়বে। আমার মনে হয় এটাই ভাল, ভাবী কি বলেন?

আমি আর কি বলবো ভাই আপনি যা ভাল মনে করেন তাই করেন। কাল কিন্তু আমার যাবার ব্যবস্থা করবেন।
আচ্ছা সে দেখা যাবে আগে ওর কিছু হোক, তারপর আপনি যাবেন। ওর কিছু হওয়া পর্যন্ত আপনি থাকেন।
এমন সময় ভাবী কিচেন থেকে খাবার জন্য ডাকলেন।
পরদিন সকালে রাশেদ সাহেব ওই পত্রিকাটা হাতে নিয়ে বের হয়ে টিউবে করে ইস্ট লন্ডনের ব্রিক লেনের দুই একটা জব সেন্টারে গেলেন। তাদের কাছে কাজের কথা বলতেই বলে ফেলল আপনার বয়স হয়েছে এখন আর এসব কাজ আপনাকে দিয়ে হবে না, রেস্টুরেন্টের মালিকেরা সবাই ইয়াং ম্যান চায়। রাশেদ সাহেবের মনটা দমে গেল। সেখান থেকে বের হয়ে পত্রিকা দেখে ঠিকানা বের করে আর একটা সেন্টারে গেল। কাজের কথা বলল।

আপনার কি কোন অভিজ্ঞ্যতা আছে?
না।
ইংরেজী জানেন?
কোন রকম কাজ চালাতে পারব মনে হয়।
কি কাজ করবেন?
দেখুন আমার কিছুই জানা নেই, যা হয় তাই দেন।
আচ্ছা কিচেন পোর্টারের কাজ করতে পারবেন?
এটা আবার কি কাজ?
তাও জানেন না?
কিচেন পোর্টার হোল হাড়ি পাতিল ধোয়া, বাসন পেয়ালা ধোয়া, আলু পিয়াজ ছিলবেন আর সেফ যা হুকুম করে তাই করবেন, পারবেন?
রাশেদ সাহেব না বুঝেই বলে ফেললো, হ্যা পারবো।
লোকটা একটা ডাইরি উল্টিয়ে ফোন নম্বর বের করে ফোন করে জানতে চাইল আপনারা একজন কিচেন পোর্টার চেয়েছিলেন, নতুন এসেছে কোন অভিজ্ঞ্যতা নেই, চলবে?হ্যা নেন আপনি নিজেই কথা বলেন বলেই রিসিভারটা রাশেদ সাহেবের হাতে দিয়ে দিলো।

রাশেদ সাহেব ফোন হাতে নিয়ে সালাম জানালো, কি বলতে হবে কিছুই জানে না।
ওপাশ থেকে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় জানতে চাইল কবে এসেছেন?
এইতো তিন দিন হলো।
ভিসা আছে?
হ্যা আছে।
কাজ করতে পারবেনতো?
চেষ্টা করে দেখব।
আমাদের এখানে থাকবেন, খাবেন, সপ্তাহে একদিন ছুটি আর সপ্তাহে একশত বিশ পাউন্ড মজুরী পাবেন।
আছা ঠিক আছে।
কবে আসতে পারবেন?

এবার রাশেদ সাহেব একটু মনির কথা ভেবে নিলেন হয়তো তিন চার দিনে ও যেতে পারবে, ভেবে নিয়ে চার দিন সময় চাইলো।
বলেই ফেললো দেখুন আমার স্ত্রি চলে যাবে সে গেলেই আমি আসতে পারব। এখনো তার টিকেট কনফার্ম করা হয়নি, আজ করবো।
আছা ঠিক আছে যেখান থেকে কথা বলছেন ওদের কাছে আমাদের ফোন নম্বর ঠিকানা সব আছে আপনি এখানে এসে ফোন করলে আমাদের লোক এগিয়ে নিয়ে আসবে।
আচ্ছা ঠিক আছে।
তাহলে এই কথা রইলো, আপনি চার দিন পর আসছেন।
হ্যা ঠিক আছে।

ফোন রেখে দেয়ার পর এক লোক এসে জানতে চাইল, আচ্ছা আমাদের যে কিচেন পোর্টার চেয়েছিলাম তার কি হলো?
হ্যা এইতো, বলে রাশেদ সাহেবকে দেখিয়ে দিয়ে বললেন এই যে ইনি।
আপনি যেখানে যাবেন ইনি সেখানকার কুক, ইনার সাথে কথা বলেন।
আচ্ছা, আমি রাশেদ। আমি মারুফ বলে দুই জনে বিলাতি কায়দায় হ্যান্ডশেক করে আলাপ শুরু করল।

ভাই আমিতো একেবারে নতুন কি ভাবে যেতে হবে, ওখানে কি কাজ করতে হবে একটু দেখিয়ে দিতে হবে। হ্যা সব দেখিয়ে দিব নেন এই ঠিকানাটা রাখেন। কোথা থেকে যাবেন, ভিক্টোরিয়া?
না সম্ভবত আমাকে হিথ্রো থেকে যেতে হবে।
আচ্ছা ঠিক আছে যেখান থেকেই যান অক্সফোর্ড নেমে বের হয়ে এসে আবিঙ্গডনের বাস ধরবেন, যেখানে এসে থামবে তার কাছেই রেস্টুরেন্ট।
তা কবে আসছেন?
রাশেদ সাহেব সব খুলে বলল, সে যাবার সাথে সাথেই আমি আসতে পারব।
আজই টিকেট কনফার্ম করবো দেখি কবে সীট পাই। বুঝতেই তো পারছেন ভাই আমি এ লাইনে একেবারে নতুন কাজেই আমাকে সব শিখিয়ে নিতে হবে।
হ্যা হ্যা সে জন্য ভাববেন না। আপনি সময় মত চলে আসবেন। তাহলে ভাই আসি।

রাশেদ জব সেন্টারের বিশ পাউন্ড পরিশোধ করে একটু খুশি মনে চলে এলো। এসেই মনিকে বলল চাকরী একটা পেয়েছি।
হায়রে রাশেদ হাসান, তুমি জান না কি চাকরী তুমি পেয়েছ। জানলে এতো খুশি হতে পারতে না। সারাটা জীবন শুধু হুকুম দিয়েই এসেছ, তোমার হুকুম তামিল করার জন্য কত জন তোমার চারপাশে ছিল, হুকুমের সাথে সাথে তা যাদুর মত হয়ে যেত। আজ যা করতে যাচ্ছ তার জন্য তুমি কখনো ভাবতেও পারনি। শুধু তুমি কেন তোমার পারিপার্শিক কেওই কখনো ভাবতে পারেনি কোন দিন তুমি এই করবে। তোমার নিয়তি তোমার জন্য এই বরাদ্দ করে রেখেছে। রাশেদের মুখে চাকরী পেয়েছি শুনে হাল ভাঙ্গা মাঝি যেমন ঝড়ের তোড়ে কূল হারিয়ে ফেলে আবার ঝড় থামলে কূলের দিকে নৌকার গলুই ঘুড়িয়ে দেবার চেষ্টা করে মনিও যেন তেমনি কূলের সন্ধান পেয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। ফিরোজ বাইরে ছিল। ফিরে এসে রাশেদের কাছে সব শুনল। মনিরা বলল ভাই এবার আমার যবার ব্যবস্থা ঠিক করে দেন। ফিরোজ টেলিফোনে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনের অফিসে কথা বলে নভেম্বরের সাত তারিখে সকালে মনিরার যাবার দিন ঠিক করে নিল।

[আবার দেখা হবে যেদিন রাশেদ আর মনিরার সাথে দেখা হবে সপ্ত ঋষিদের তারার বাগানে। যেখানে থাকবে অরুন্ধতি, স্বাতী আর আরও অনেক তারার মেলা।]

No comments:

Post a Comment

Thank you very much for your comments.