Thursday, 29 November 2012

নক্ষত্রের গোধূলি-২৬ [২য় অধ্যায়]


[পূর্ব সূত্র; নক্ষত্রের গোধুলি-২৫, রাশেদের হঠাত মনে হলো তার কাছে যে পাউন্ড গুলি আর অল্প কিছু বাংলাদেশি টাকা রয়েছে সেগুলি মনির কাছে দিয়ে দিতে হবে। পকেট থেকে বের করে মনির হাতে বুঝিয়ে দিল।]
মনি বলল তুমি কিছু রেখে দাও, না হলে চলবে কি করে?
হ্যা এইতো আমার জন্য দুইশ পাউন্ড রেখে দিলাম। আমি ফোন করে বাড়িতে জানিয়ে দিচ্ছি তবুও যদি ওরা কেউ ঢাকা এয়ারপোর্টে আসতে না পারে তাহলে তুমি একটা ক্যাব নিয়ে চলে যেও, এই যে দেশের টাকাটা আলাদা করে সামনে রাখ।
লন্ডন এবং কুয়ালালামপুরের বোর্ডিং কার্ড, হোটেল রিজার্ভেশন কার্ড, পাসপোর্ট সব কিছু মনিকে ভাল করে বুঝিয়ে দিল।
সাবধানে রাখবে। যেখানে যেটা দেখতে চাইবে সেটা দেখিয়ে আবার সাথে সাথেই ব্যাগে ভরে রেখো। দেখবে কিছু ফেলে দিও না বা ফেরত না নিয়ে চলে যেও না। বিশেষ করে এই পাসপোর্ট তো জানই এর কি কাজ। এটা হারালে কিন্তু আবার তোমাকে খোজার জন্য আমাকে বের হতে হবে।
কেন, খোজার আর কি দরকার?
কি যে বল তুমি! না খুঁজলে আমি মনি পাব কোথায়? আচ্ছা শোন, ক্ষুধা লেগেছে, কিছু খাবে?সকালে আসার আগে কিছু খেতে পারনি।
না ক্ষুধা লাগেনি।
তা হলে এক সাথে দু কাপ কফি খাই।
কত লাগবে?
কি জানি, মনে হয় চার পাউন্ডের মত লাগতে পারে।
বাংলাদেশের সমান কত হবে?
এই চারশ টাকার মত হতে পারে।

চারশ টাকা দিয়ে দু কাপ কফি খাব?
থাক আমার কফি খেতে হবে না।
দেখ না আশে পাশে চুমুর বাহার দেখ, আমরা তো আর তা পারছি না তাই বলছিলাম এই হয়তো আমাদের শেষ দেখা তাই ………।
কথা শেষ করতে না দিয়ে মনি চমকে উঠে বলল,
কি বললে! শেষ দেখা মানে কি?বল, তুমি এ কথা কেন বললে?
না মনি, আমি আর কিছু ভেবে বলিনি। তুমি যাচ্ছ, তোমাকে যেতে হবে। দেশে আমাদের সন্তানরা রয়েছে তোমাকে ওদের মা, ওদের বাবা হয়ে থাকতে হবে। তুমি যাও। দেশের প্রতি আমার আর কোন মোহ নেই। জীবনের উপর আমার একট বিতৃষ্ণা এসে গেছে। বেচে থাকারও কোন উত্সাহ পাচ্ছি না। ওদের জন্য, তোমার জন্য উপার্জন করতে হবে তাই থাকা।
না লক্ষ্মী সোনা, ওকথা আর মুখে এনো না, মনেও না। তুমি আছ ভাল থাক এতেই আমার শান্তি। মেয়েরা জানবে ওদের বাবা আছে আবার ফিরে আসবে সেই আশায় পথ চেয়ে থকব। তোমাকে যেমন আমার প্রয়োজন আছে মেয়েদেরও তেমনি প্রয়োজন আছে। তোমাকে সবার জন্য সুস্থ থাকতে হবে। এমন আবোল তাবোল কথা আর ভেবো না।
মনি,
রাশেদ ডাকল।
বল।

এখানে যা দেখে গেলে তার থেকে যে শিক্ষা আমরা পেলাম তা ভুলে যেয়ো না, মনে রেখ। দেশে গিয়ে কাওকে কিছু বলারও দরকার নেই।
সবাই তো জিজ্ঞ্যেস করবে, তখন কি বলব?মেয়েরা যখন জিজ্ঞ্যেস করবে মেঝ কাকুর বাসায় থাকলে না কেন?তখন কি বলব?
কি জানি মনি, আমার মাথায় কিছু আসছে না, তুমি উপস্থিত সময় বুঝে যা হোক কিছু বলে দিও। নিজের চোখে দেখে গেলে টাকার কি প্রয়োজন, টাকা দিয়ে রক্তের সম্পর্কটাও কি ভাবে মুছে ফেলা যায়।
টাকা না থাকলে মানুষের কোন মূল্য থাকে না। যার টাকা নেই তাকে আর মানুষের প্রয়োজন হয় না। আমার টাকা থাকলে আজ তোমাকে এভাবে ফিরে যেতে হতো না। অন্তত আর কয়েকটা দিন আমার কাছে থাকতে পারতে, আমি তোমাকে দেখতে পেতাম। আচ্ছা মনি, এই যে সবাই আমাকে ত্যাগ করল তুমি করছ না কেন?
মনি রাশেদের একটা হাত ধরে বলল, তুমি যে আমার তাই। তুমি এত বোকা কেন, বোঝ না?আমার তো তোমার টাকার দরকার নেই আমার শুধু তোমাকে দরকার। অনেকের জীবনে অনেক ধরনের সময় আসে, অনেক ধরনের পরীক্ষা এসে উপস্থিত হয়। জানিনা সামনে আমাদের কেমন দিন অপেক্ষা করছে, যদি তেমন কোন দিন কখন আসে তাহলে আমি তোমাকে ঝি গিরি করে হলেও খাওয়াবো। আর তুমি বলছ কিনা তোমাকে ত্যাগের কথা, ছিঃ ও কথা তুমি ভাবলে কি করে?তুমিই আমার সব, আমার পৃথিবী। তুমি ছাড়া এ পৃথিবীর কি মূল্য আছে, বল। এধরনের চিন্তা কক্ষনো যেন মাথায় আসে না।
না মনি, আমার সব কিছু কেমন যেন এলেমেলো হয়ে গেল, কিসে কি বলব কি করব মাথায় আসছে না। ধৈর্য ধর, আল্লাহর নাম স্মরন রেখ, ঠিক ভাবে নামাজ পরবে, ব্যাগে কোরান শরীফ রেখে গেলাম মাঝে মাঝে সময় করে পড়বে। এক সময় সব ঠিক হয়ে যাবে। ওষুধ গুলি মনে করে খেও।
হঠাত রাশেদ হাতের ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখল নয়টা বেজে গেছে। এখনি মনিকে সিকিউরিটি গেট পেরুতে হবে।
মনি, আর সময় নেই তোমাকে ভিতরে যেতে হবে।

আস্তে আস্তে ওরা গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মনিরার এক হাতে ব্যাগ অন্য হাত রাশেদের হাতে ধরা। ক্রমেই সে হাতে চাপ বেড়ে যাচ্ছে যেন কঠিন ভাবে চেপে ধরে রাখলেই মনি যেতে পারবে না। গেটের কাছে এসে মনিরা বলল হাতটা ছাড়।
রাশেদ চমকে হাত ছেড়ে দেখে মনির হাত লাল হয়ে গেছে।
যা বললাম মনে রেখ, আসি তাহলে।
বলেই মনি সোজা এগিয়ে গেল। রাশেদের ঠোট কেপে উঠলো, কিছু বলতে চেয়েও পারলো না মনি বেশ কিছু দূরে চলে গেছে। যত ক্ষন দেখা গেল রাশেদ চেয়ে রইল। বুকটা শূন্য হয়ে গেল, এত ক্ষন বুকের মধ্যে কি যেন ছিল মনি তার সবটাই ফাকা করে নিয়ে গেল। হতবিহ্বলের মত গেটের দিকে তাকিয়েই রইল। কতক্ষণ এ ভাবে ছিল খেয়াল নেই। পাশে দিয়ে যাওয়া এক দল কালো মানুষের চিতকারে ওর সম্বিত ফিরে এলো, সামনে দেখল মনি নেই। ঘড়িতে দেখল পৌনে দশটা বাজে। মনি নিশ্চয় এতক্ষণ ওয়েটিং লাউঞ্জে অপেক্ষা করছে। ওকে যে অক্সফোর্ড যেতে হবে তা মনেই নেই।
পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ, চশমা মুছে নিলেন। এমন সময় দেখতে পেল কায়সার বেয়াই মাত্র ঢুকছে। রাশেদকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো
বেয়াইন কোথায়?
আপনি এতো দেরি করলেন?
আরে বলবেন না আর্লস কোর্ট থেকে চেঞ্জের সময় হিথ্রোর পিকাডেলি লাইনে না উঠে ভুলে ডিস্ট্রিক্ট লাইনে উঠে উইম্বলডনের দিকে চলে গিছিলাম, ফুলহ্যাম পর্যন্ত গিয়ে দেখি এতো উইম্বলডন যাচ্ছে, তারাতারি নেমে আবার আর্লস কোর্ট ফিরে এসে পিকাডেলি লাইন ধরে এলাম।
আমিতো আপনাকে না পেয়ে ভেবেছি আপনি হয়তো ভিতরে চলে গেছেন, তাই ওকে ভিতরে পাঠিয়ে দিয়ে বলে দিয়েছি ওয়েটিং লাউঞ্জে গিয়ে বেয়াইকে খুঁজলেই পাবে, সে তো কানার মত খুজছে আপনাকে।
তাহলে বেয়াই আপনি যান আমাকে আবার অক্সফোর্ড যেতে হবে, আমি তাহলে চলি।
বলেই পিছন ফিরে বের হবার গেটের দিকে এগিয়ে গেলেন।

ওহে অর্থ, ওহে বিত্ত, ওহে সম্পদ আজ এই পঁয়তাল্লিশ বত্সর বয়সে এসে তুমি আমার মনিকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিলে?আমার মনি আমাকে একা এই নির্জন বনবাসে রেখে একা চলে গেল?এমন হবার কথা ছিল না। কেন এমন হল?এ সময় মনিকে নিয়ে সন্তানদের নিয়ে সুখের সংসারে সোহাগে আহ্লাদে আমোদে কাটাবার কথা ছিলো, তাহলে?এ কি হলো?এই জন্যই কি মাত্র উনিশ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে বের হয়েছিলাম?এই কি তার পরিণতি?সত্যিই অর্থ, তুমি মহান, তুমি বড়ই শক্তিবান। তোমার শক্তির জোড়ে চলছে বিশ্ব। তুমি যাকে ধরা দিয়েছ সেই ভাগ্যবান আর যাকে ঘৃনা করেছ সেই হতভাগা। অথচ যার প্রয়োজন তুমি তার কাছ থেকে দূরে সরে থেকেছ, পালিয়ে বেড়িয়েছ। যার প্রয়োজন নেই তার সাথেই তোমার যত প্রেম যত মাখামাখি। কেন এই লীলা?কেন এই প্রহসন?কোথায় রয়েছ তুমি, আমার এই কথা কি শুনতে পাচ্ছ?জবাব দাও। জবাব দাও। আর কত কাল তমার এই লীলা চলবে?তোমার বোধোদয় কবে হবে?কবে?তুমি কি অন্ধ?কারো চোখের নোনা জলে কি তোমার পাষান হৃদয় ভিজে উঠে না?চোখের নোনা জলের, হৃদয় দুমড়ানো মোচড়ানোর কোন মূল্য কি তোমার কাছে নেই?তুমি কি এতই কঠিন, এতো বড় পাষান তুমি?

ভাবতে ভাবতে রাশেদ সাহেব স্যুটকেসের হ্যান্ডেল ধরে কাধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বার বার পিছনে ফিরে দেখছিল, যদি মনি ফিরে এসে তার সামনে দাঁড়ায় তা হলে আবার একটু দেখতে পেত এই আশায়। রাশেদ সাহেব ভাল করেই জানে তা হবার নয়। তবুও মিছে আশায় ভেজা চোখে ফিরে ফিরে দেখতে দেখতে টার্মিনাল থেকে বের হয়ে এলেন।
২য় অধ্যায় শেষ
[আবার দেখা হবে যেদিন ঝুর ঝুর করে ঝরা স্নো মাখানো ধূসর কোন পূর্ণিমা রাতে যখন রাশেদ সাহেব তার মনিরার স্বপ্নে বিভোর হয়ে অশ্রু জলে বালিশ ভেজাবে তেমনি কোন নোনা জলে ভেজা মায়াবী রাতের নিশূতি প্রহরে।]

No comments:

Post a Comment

Thank you very much for your comments.