Thursday, 29 November 2012

নক্ষত্রের গোধূলি -২৭ [৩য় অধ্যায়]


[পূর্ব সূত্রঃ- রাশেদ সাহেব ভাল করেই জানে তা হবার নয়। তবুও মিছে আশায় ভেজা চোখে ফিরে ফিরে দেখতে দেখতে টার্মিনাল থেকে বের হয়ে এলেন।]


হিথ্রো এয়ার পোর্ট, তিন নম্বর টার্মিনাল। রাশেদ সাহেব একটা ভাঙ্গা চূর্ণ বিচূর্ণ ক্ষত বিক্ষত মন, উদ্ভ্রান্তের মত চেহারা, ভেজা দুটা চোখ আর তার মনির গুছিয়ে রেখে যাওয়া দুটা লাগেজ নিয়ে বেরিয়ে এসে বাস স্ট্যান্ড খুজতে লাগলেন। কোথায় বাস স্টান্ড তা জানেন না। এর আগে কখনো এদিকে আসেননি। কাউকে যে জিজ্ঞেস করে জেনে নিবেন সে জন্য তো কাউকে রাস্তায় থাকতে হবে কিন্তু সেরকম কাউকে দেখা যাচ্ছে না। লোক জন দুই এক জন যা দেখা যাচ্ছে তা শুধু গাড়ির ভিতরে, তা তাদের গাড়ি থামিয়ে তো জিজ্ঞেস করতে পারেনা। রাশেদ সাহেবের সেরকম সাহস নেই। তাছাড়া এদেশে সেটা মানানসই হবে বলেও মনে হয়না।

গাড়ির চলাচল দেখে অনুমান করে এক দিকে হাটতে শুরু করলেন। সাথে একটা স্যুটকেস আর একটা ব্যাগ। কোনটাই কম ভারি নয় তবুও রক্ষা যে সুটকেসটার হ্যান্ডেল ধরে চাকার উপর টেনে নেয়া যায়। মনি যা পেরেছে ঠেসে ভরে দিয়ে গেছে। শুধু কি তাই?সাথে সহস্রাধিক উপদেশ, ওষুধের ব্যাগটা বার বার করে দেখিয়ে দিয়েছে। অনুমান করে হাটা সুরু করলেও মোটামুটি সঠিক পথেই এসেছেন। কিছুদূর এসে দেখেন সামনে কয়েকটা কোচ দেখা যাচ্ছে, ন্যাশনাল এক্সপ্রেস। তাতে বিভিন্ন গন্তব্যের নাম লেখা, কার্ডিফ, সাউদাম্পটন, লিভারপুল, প্লিমাউথ, লীডস আরো অনেক কিন্তূ রাশেদ সাহেবের গন্তব্য হলো অক্সফোর্ড।

যাই হোক স্ট্যন্ড যখন পাওয়া গেছে নিশ্চয় তার বাস ঠিকই পাবেন। আস্তে আস্তে এগিয়ে আসলেন। স্ট্যান্ডের কাছে এসে অক্সফোর্ড এর স্ট্যন্ড পেলেন। দেয়ালে লাগানো সময় সুচী দেখলেন অক্সফোর্ড এর গাড়ি ছারবে আরো ১৫ মিনিট পর। দাড়িয়ে রইলেন। না সুধু সুধু দাড়িয়ে নয় আবার তার মনির চিন্তা। মনি এখন কোথায় কত দূর গেছে, ও কি প্লেনে একা ভয় পাচ্ছে, প্লেনে কি আদৌ উঠতে পেরেছে, নিজেকে কি সামলে নিতে পেরেছে? একা তো কখনো কোথাও যাবার প্রয়োজন হয়নি। মনি একা একা কোথাও যাবে এ তো মনি বা রাশেদ কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। আজ তার মনিকে এই বিশাল পথ একা যেতে হবে। রাশেদের চোখ বেয়ে কি পানি আসছিল? তাহলে চশমা সরিয়ে রুমাল দিয়ে চোখ মুছলেন কেন?

ভাবনার সাগরে যখন হারিয়ে যেতে শুরু করেছিলেন ঠিক তখনই একটা কোচ এসে দাঁড়াল। চেয়ে দেখে কোচের সামনে অক্সফোর্ড লেখা। হয়তো কোচটা অক্সফোর্ড থেকে আসলো। ৪/৫ জন যাত্রি নামল গাড়ি থেকে। প্রায় সাথে সাথে ড্রাইভার ও নামল কোচের দরজাটা বন্ধ করে। শীতের দিন, হলুদ রঙের হাই ভিজিবল জ্যাকেট গায়ে, ভিতরে নেভী ব্লু জ্যাকেট আর টাই দেখেই রাশেদ সাহেব বুঝলেন ইনি ড্রাইভার।

কোথায় টিকেট করবেন তেমন কিছু খুজে পেলেন না। অপেক্ষা করলেন। হ্যা একটু পরেই অন্য একজন ড্রাইভার এগিয়ে আসল। এর পরনেও একই ধরনের পোষাক। কোচের কাছে এসে বনধ দরজা খুলে পাশে দাঁড়াল। ওই স্ট্যন্ডে রাশেদ সাহেব ছারা অন্য কোন যাত্রি নেই। রাশেদ সাহেব এগিয়ে ড্রাইভার কে জিজ্ঞেস করলেন আমি অক্সফোর্ড যাব কিন্ত টিকেট কোথায় পাব? ড্রাইভার বলল আমি গাড়িতেই টিকেট দিব। একটু দাড়াও তোমার সাথের মালামাল গুলি আগে উঠিয়ে নাও বলেই পাশের লাগেজ বক্সের পাললা টা খুলে লাগেজ দুটো উঠিয়ে জানতে চাইল কোথায় নামবে, অক্সফোর্ড?
হ্য।
কিছুক্ষন পর ড্রাইভার উঠে ড্রাইভিং সীটে বসে বলল ওঠো।
রাশেদ সাহেব উঠে বলল কত ভারা?
১৪ পাউন্ড।
পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে ২০ পাউন্ডের একটা নোট বের করে দিলেন। ড্রাইভার ভাংতি ৬ পাউন্ড আর সাথে ভাউচার এর মত একটা টিকেট লিখে দিলে ওগুলি নিয়ে পকেটে রেখে সুবিধা মত একটা সীটে বসলেন সমস্তটা বাসে সে একাই যাত্রি। সময় মত কোচ ছেড়ে দিল। কোথায় যাচ্ছেন, সেখানে কি করবে‌ তার কাজ কি হবে, আসে পাসের লোকজন কেমন হবে ইত্যাদি নানান রকম চিন্তা। সে তো কিচেন পোর্টার এর কাজ পেয়েছে। কিচেন পোর্টার আবার কি জিনিস তা রাশেদ জানেনা, ফিরোজ ও এ ব্যাপারে কিছু বলেনি। আসলে জানতে চাওয়াই হয়নি।

দুর্বলের উপর যখন সবলের অত্যাচার চরম পর্যায়ে পৌছে যখন দুর্বলের কিছু করার থাকে না। দুর্বলের মনের যে হাহাকার তা শোনার মতো কেউ থাকে না। সে যে কত মর্মান্তিক কত হৃদয় বিদারক। এই আঘাত শুধু মনের, আর মনের তো রক্ত নেই তাই তা দেখা জায়না কতটা আঘাত সে পেয়েছে। রক্ত থাকে শরীরের মাংসে, হাড়ে মজ্জায়। মনের যদি রক্ত থাকত তাহলে যে কত মন রক্ত ক্ষরন দেখতে পেতাম সে হিসাব করতে পারব কি আমরা? নাকি মন রক্তের কোন মুল্য আমরা জানি?আমরা শুধু জানি আহা মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রান হল বলিদান। কিন্তু যে বলিদান হল সে তো চলেই গেল যে বলিদান হতে পারল না তার মন যে চুর মার হোল সে কথা কি কখন জানতে পেরেছি না জানতে চেয়েছি?

নাকি কারো দিকে তাকিয়ে দেখেছি কত মন রক্ত ক্ষরন হচ্ছে। শরীরের আঘাতে রক্ত ঝরে নয়ত হাড় মাংশ থেতলে বা ভেঙ্গে যায়। যা চিকিত্সা করা যায়, জোড়া তালি দেয়া যায়, সেলাই করা যায়। দরকার হলে ভিন্য শরীর থেকে রক্ত হাড় মাংশ এনে পুরন করা যায়। যার মন ভেঙ্গে গেছে তার কি চিকিত্সা? ভিন্ন মন এনে কি তার মন জোড়া যায়? মন কি সেলাই কয়া যায়? কেন যায়না তা হলে সে কি করে ভাঙ্গা ক্ষত বিক্ষত মন নিয়ে বেচে থাকবে? বাসের সিটে বসে ভাবছিলেন। দুপাশের কোন দৃশ্য তার চোখে পরেনি। কতক্ষণ সময় গেছে তাও চোখে পরেনি। মনি কিভাবে পৌঁছবে, মেয়েরা কি ভাবে মানুষ হবে আমি কত দুর কি করতে পারব, কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে ভাগ্য, ফেলে আসা জীবন, আমার ভুল কোথায় ছিল আদৌ কোন ভুল ছিল কি? হ্য ভুল তো অবশ্যই ছিল। অনধ বিশ্বাস আর সরলতা। কামরুল তো বলেছিলই তুমি যা করতে যাচ্ছ তার মুল্য কি পাবে? তোমার যে মানসিকতা তুমি কি পারবে মানিয়ে নিতে? কিছু মনে করনা বাবা মা যাই বল কেউ কিন্তু স্বার্থের বাইরে নয় তুমি যতক্ষণ দিতে পারবে ততক্ষণ তুমি ভাল। যখনই দেয়া বন্ধ হবে তখনি শুরু হবে দন্দ? ভেবে দেখ তোমার ফ্যামিলি চাইবে এক রকম আর তোমার বাস্তব হবে অন্য রকম। মাঝ থেকে তোমার বউ ভুগবে তোমার মেয়েরা ভুগবে তাদের মনে কিন্তু ভিশন প্রভাব পরবে। অফিসের কলিগরা সবাই বলেছিল রাশেদ সাহেব ভালো করে চিন্তা করে চাকরি ছারবেন। বস ক্যাপটেন মাযহার তো ছাড়তেই চাননি। বলেছিলেন দেখুন এসব ক্ষে্ত্রে যা হয়, আপনি কিনতু পারিবারিক সমর্থন পাবেন না আর তখন কিনতু আপনার দুই দিক সামাল দেয়া কঠিন হয়ে দাড়াবে। আপনার কিন্তু অত টাকা নেই।

না মেয়েরা ভুগছে ঠিকই কিন্তু তারা মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে আর মনি সে তো তার পক্ষে যা সম্ভব তা তো করেছেই যা সম্ভব নয় তাও করার চেষ্টা করেছে এই সব ভাবছিলেন। এলো মেলো ভাবে কত কি আসছিল মনে। আজ স্ত্রী সন্তান ছারতে হল, সংসার ছাড়তে হল, দেশ ছাড়তে হল।
কিছুক্ষণ পর কোচ লন্ডনের ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশনে এসে দাঁড়াল। সেখানে দশ বারো জন যাত্রি উঠে যার যার সীটে বসার মিনিট চার পাঁচের মধ্যেই কোচ আবার ছেড়ে দিলো।

লন্ডন শহর পেরিয়ে মটর ওয়েতে যখন বেরিয়ে এলো তখন গাড়ির গতি দেখেই বোঝা যায় নির্বিঘ্নে কোন রকম বাধা হিন ভাবে এক গতিতে চলছিল। সমস্ত গড়িতে কোন সারা শব্দ নেই। চুপ চাপ, শুধু গারি চলার শব্দ। দুই ঘন্টা পরে যখন কোচ এসে অক্সফোর্ড কোচ স্টেশনে দাঁড়াল কোচ থেকে নেমে মালামাল গুলি নিয়ে দাড়িয়ে অনেকক্ষণ এদিক ওদিক তাকিয়ে তার পথের সন্ধান পেতে চেষ্টা করল কিন্তু ডান বাম সামনে পিছনে সবই তো তার কাছে সমান। কোন দিকে যাবে কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। এখানে বেশ লোক জন আছে। যাচ্ছে আসছে দাড়িয়ে গল্প করছে। পাশেই কফি শপ সেখানে চা কফি নানান কিছু খাচ্ছে। তাদেরই এক জনকে জিজ্ঞেস করল আমি আবিংডন যাবার বাস কোথায় পাব? কিন্তু সে যা বলল তা রাশেদ সাহেব কিছুই বুঝতে পারল না। হা না বলে মাথা ঝেঁকে কোন রকম তার হাত থেকে রেহাই নিয়ে মোটামুটি ওই দিকে এগিয়ে যাবার ভান করে অন্য একজনকে আবার ওই একই প্রশ্ন। এবারের লোকটা বয়স্ক। সে রাশেদ সাহেবের পা থেকে মাথা পর্যন্ত আর সাথের মালামাল গুলি দেখে বলল আস আমার সাথে।

ভারি ব্যগটা কাধে ঝুলিয়ে স্যুটকেসটা হ্যান্ডেল ধরে টেনে তার সাথে হাটতে হাটতে পিছন দিকে টার্মিনালের বাইরে এসে দাড়াল। লোকটা হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল এই রাস্তাটা পার হয়ে ওই যে রাস্তা দেখা যাচ্ছে ওই খানে বাম পাশে যে গাছটা দেখছ ওখানেই বাস স্ট্যন্ড। বেশি দূরে নয়, কাছেই ৩/৪ মিনিটের পথ মাত্র। ওখানে তুমি আবিংডনের বাস পাবে। এক হাত বারিয়ে দিয়ে হ্যান্ড শেক করে আনেক ধন্যবাদ জানিয়ে আবার হেটে গাছের নিচে এসে দাড়াল।

সুন্দর ছাউনি দেয়া ছোট্ট বাস স্ট্যান্ড, কাচের দেয়াল, ভিতরে বেঞ্চ আছে। তাকিয়ে দেখল বিভিন্ন বাসের সময় সুচী লেখা পোস্টারের মত কাচের দেয়ালে লাগানো। খুজে দেখল তার দরকার যে বাস ওটা আসতে আরো দশ পনের মিনিট বাকি। একটা সিগারেট হলে ভাল হত পকেটে হাত দিতেই মনে হল সে তো রোজা। সিগারেট আর বের করল না। আশে পাশে তাকিয়ে দেখল ডান দিকে একটু দূরে ট্রেন স্টেশন দেখা যাচ্ছে। এবারে ওই জব সেন্টারে দেখা মারুফ সাহেবের দেয়া ঠিকানা টা পকেট থেকে বের করে দেখল জর্জ স্ট্রীট, আবিংডন। রেস্টুরেন্ট এর নাম হোল্ডিং নং মনে থাকবে। চার দিকে দেখতে দেখতেই বাস এসে দাড়াল। মাল পত্র নিয়ে উঠে পরতেই ড্রাইভার মাল রাখার জায়গা দেখিয়ে দিল। যাত্রীদের মালামাল রাখার জন্য গেটের পাশে আলাদা জায়গা আছে। ওগুলি রেখে ড্রাইভারকে ২ পাউন্ড ১০ পেনি ভারা দিয়ে টিকেট নিয়ে সামনের একটা সীটে বসে পরল। এতক্ষণ কি ভাবনাই না ভাবছিল। লোকাল বাসে এই মাল পত্র কিভাবে কোথায় রাখবে? সে তার নিজের দেশের মত করেই ভেবে নিয়েছিল। যাই হোক বেশিক্ষণ লাগেনি কিছুক্ষণের মধ্যেই পথে দু এক জায়গায় থেমে শেষ এক জায়গায় এসে দাঁড়াল বাসটা। লোকজন নামার ভাব দেখেই অনুমান করল এটাই গন্তব্যের শেষ।

বাস থেকে নেমে আবার এদিক ওদিক তাকিয়ে সুবিধা মত একজনকে ঠিকানাটা দেখাতেই দেখিয়ে দিল ওই যে ওইটা জর্জ স্ট্রিট। এদেশের ঠিকানা খুজে বের করার কায়দা লন্ডনে ফিরোজ শিখিয়ে দিয়েছিল। রাস্তার এক দিকে যোড় নম্বর এবং অপর দিকে থাকবে বেজোড় নম্বর। সেভাবেই এগিয়ে মিনিট পাঁচেক হেটে একটু দূর থেকেই রেস্টুরেন্টের নাম দেখতে পেল। কাছে গিয়ে দেখে রেস্টুরেন্ট খোলা। একটু ইতস্তত করে কাচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকেই বাংলা চেহারার একজনকে দেখল চেয়ার টেবিল মুছতে। তখন প্রায় একটা বাজে।
[আবার দেখা হবে যেদিন শীতের শেষে বসন্তের চঞ্চল সমীরণ বইবে সেদিন।]

No comments:

Post a Comment

Thank you very much for your comments.