Wednesday, 28 November 2012

নক্ষত্রের গোধূলি-২১ [২য় অধ্যায়]

[ পূর্ব সূত্রঃ নক্ষত্রের গোধূলি-২০, ওর এই গান গুলি গাইতে গিয়ে আমাকে অনেক সাধনা করতে হয়েছে। সুরও কি দুলাভাই করে না কি আপনি করে নেন? না ভাই আমি ও সব পারি না তবে ওর এক বন্ধু আছে সেই করে দেয়। এখন আবার বড় মেয়েটাও করে।]
সত্যিই আপা আপনি অসাধারন।
না ভাই এভাবে বলবেন না।
কেন বলবো না, আপনি তো সাধারণের চেয়ে সম্পূর্ন ভিন্ন প্রকৃতির। এমন আমি খুব কমই শুনেছি।
আসলে কি ভাই আপনার দুলাভাই এমন একজন মানুষ যাকে ছাড়া আমি কিছু ভাবতে পারি না, সামান্য একটা কাজও যদি ওকে জিজ্ঞেস করে না করি তবুও মনে একটা খুত খুতানি থেকেই যায়। ওর গান যখন গাই তখন আমার মনে হয় আমি সত্যিকারেই ওর। মেয়ে গুলিও হয়েছে এমন যে বাবাকে ছাড়া কিচ্ছু বুঝে না।
বাইরে থেকে ফিরতে একটু দেরী হলেই আম্মু বাবা ফিরছে না কেন?কি বলে গেছে নানান প্রশ্ন। বাবা কোথায়, বাবা খেয়েছে নাকি, বাবা এটা খায়নি কেন এই রকম। বড় জন তার এডভাইজার তাকে জিজ্ঞেস না করে সেও কিছু করবে না, মেঝ জন দেখে বাবার পোষাক আসাক, বাইরে কোথাও যাবার সময় কি পরে যাবে বাড়িতে কি খাবে এইসব দেখে আর ছোট জন হচ্ছে তার পিএ, বাবার সব জিনিস পত্র কাগজ পত্র এটা সেটা গুছিয়ে রাখবে। ওর বাবাও কিছু খুজে না পেলে ছো্ট জনকেই বলবে আব্বু গ্যাস বিলের ফাইলটা পাচ্ছি না, দাঁড়াও এনে দিচ্ছি। অনেক কথা বলে ফেললাম।
আপা চলেন রান্না ঘরে যাই। কি খাবেন বলেন, রান্না করি এখানে ইফতার করে খেয়েদেয়ে যাবেন।
না রুবি কিছু করবে না, ওখানে ভাবী রান্না করছে।

রুবির স্বামী বলল তাই কি হয় নাকি?কোনদিন আসেন নি, আর এখানে আমরা নিজেদের মানুষ পাই কোথায় বলেন, যে ভাবেই হোক আপনারা এসেছেন না খেয়ে যাবেন তাই কি হয়?
রোজা না হলে হয়ত কিছু খেয়েই যেতাম।
না না তা হবে না।
না ভাই পরে সময় হলে আর একদিন আসবো আজ না আজ বিকেলে আমাদের গ্লস্টার যেতে হবে।
গ্লস্টার কেন?
কায়সার বেয়াই বললো ওখানে উনার ভাই থাকে।
তো খেয়ে যান এ দেশে ঘড়ে সব কিছুই রাখতে হয়, সব সময় বাজার করা যায় না। রান্না করুক এক সাথে বসে খাওয়া, এইতো।
না ভাই আজ কিছুতেই সম্ভব না। দুপুর একটা নাগাদ ওরা উঠলো। কায়সার বেয়াই সহ কাদের ওদেরকে গাড়িতে করে টিউব স্টেশন পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল।
কায়সার বেয়াই আর রুবির স্বামী কাদের ওদের টিউব স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে আবার আসার অনুরোধ জানিয়ে চলে গেল। যাবার আগে বেয়াইর সাথে আবার কবে কখন কোথায় দেখা হবে সে ব্যাপারটাও ঠিক করে নিল। ওরা চলে যাবার পর রাশেদ আর মনিরা টিউব স্টেশনে নেমে দেখে একটা ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। তারাতারি ওতে উঠে বসল। ট্রেন ছাড়ার আগ পর্যন্ত চতুর্দিকে মানুষের চলা ফেরার ভাব দেখছিল।

ওই আগের মত কারো কোন দিকে তাকাবার সময় নেই, সবাই ছুটছে।
তাই দেখে মনিরা বললো এরা উন্নতি করবে না কেন, দেখেছ সবাই কি ভাবে ছুটছে।
কয়েক মিনিটের মধ্যে স্টার্টফোর্ড স্টেশনে নেমে আবার সেন্ট্রাল লাইনের ট্রেন কোন প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে খুজে বের করে ওখানে এসে দাঁড়াল। প্ল্যাটফর্মের উপরে মনিটরে দেখাচ্ছে সেন্ট্রাল লাইনের ট্রেন আট মিনিট পরে আসবে। এখানেও মানুষ আর মানুষ গিজ গিজ করছে কিন্তু সবাই দৌড়ের মত ছুটছে। একই দৃশ্য। ট্রেনের জন্য যারা দাঁড়িয়ে বা বেঞ্চে বসে আছে তাদের প্রায় সবার হাতে পড়ার মত কিছু পড়ছে আবার কেউ তার সঙ্গি বা সঙ্গিনীকে চুমু খাচ্ছে। রাশেদ সাহেব মনিরাকে ইশারা করে এমন একটা দৃশ্য দেখাল। মনিরার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল, এসব আবার কি?। আহা, তুমি লজ্জা পাচ্ছ কেন?তোমাকে কি কেউ, এপর্যন্ত বলেই থেমে গেল। এরা এসবে কিছু মনে করে না।
দেখ কে কাকে দেখছে, কেউ ওদের দেখছে?দেখবে না। এটাই এদেশের রীতি। মনে করে এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে কেউ কাউকে জোর করে কিছু করতে গেলেই বিপত্তি। আমরা আপন মনে নিজেদের মাঝে সুখে আছি তাতে কার কি, এমন একটা ব্যাপার। তোমার কেউ নেই তুমি দেখবে না। তোমার ইচ্ছা হলে তুমি তোমার মানুষের সাথে কর কেউ নিষেধ করবে না। বুঝলে মনি বিবি?এই হচ্ছে সভ্যতা। তা তোমার কি একটুও ইচ্ছা হচ্ছে না, আমি কি তোমার এতোই না পছন্দের?
অসভ্য বলে মনিরা একটা গাল দিল।
কে, আমি না ওরা?
ওরা হবে কেন, তুমি।
যে দেশে যে রীতি।

দেশের কোন স্টেশনে দাঁড়িয়ে কি তোমাকে কখনো বলেছি?ওই দেখ এই শীতের মধ্যে মেয়েটা কেমন শর্ট স্কার্ট পরে আছে আমি কি তোমাকে অমন পোষাক পরতে বলেছি?শুধু—। বলেই সত্যিই রাশেদ সাহেব মনিরাকে জড়িয়ে ধরে বলল এখন তুমি চিৎকার করলেই পুলিশ এসে আমাকে ধরে নিয়ে যাবে। তখন তুমি বাসায় যাবে কার সাথে?কি, ভাবছ পুলিশ আসবে কি ভাবে?ওই দেখ কতগুলি ক্যামেরা। এই ক্যামেরা দিয়ে এখানে কে কি করছে সব কন্ট্রোল রুমে বসে দেখছে। কাজেই তুমি চিৎকার করার সাথে সাথেই দেখবে পুলিশ এসে হাজির। বিশ্বাস না হয় পরীক্ষা করেই দেখ, একবার একটু চিৎকার করেই দেখ কি হয়।
ছাড়ত, কি যে পাগলামি কর, তোমার পাগলামি আর গেল না। ওরা যা করছে করুক, তাই বলে তুমিও কি তাই করবে নাকি?
এমন সময় বেরসিক ট্রেনটা গড় গড় করে এসে আস্তে করে সামনে দাঁড়ালো। রাসেদ সাহেব মনিরাকে ছেড়ে হাত ধরে ট্রেনে উঠে পরলো। সিট খালি ছিল। বসে আবার ওই কথার সূত্র ধরে বলল
বিলাতে এসেছ আর বিলাতি রীতি মানবে না এটা কেমন কথা বুঝলাম না।
একটু থামবে নাকি বকবক করবে?আর কোন কথা শুনতে চাই না।
আচ্ছা ম্যাডাম, চুপ করলাম।
কিছুক্ষন একটু থেমে থেকে আবার বলল
তাহলে তখন পুলিশ ডাকলে না কেন?
এবারে মনিরা আর চুপ থাকতে পারল না, হেসে ফেলল।
তুমি আসলেই পাগল।

আর আমাকে পাগল করেছে কে?তুমিই তো পাগল বানিয়েছ। এখন পাগলের পাগলামি সামলাবে না?নাকি কোন মেম সাহেবের সাহায্য নিতে হবে?
আবার কথা, বলেছি না একটু চুপ কর।
বলতে বলতেই ট্রেন ইস্ট একটন স্টেশনে এসে দাঁড়াল। ছোট্ট স্টেশন, মনিরার হাত ধরতে গিয়েও ছেড়ে দিল,
ম্যাডামের মনটা কি ঠান্ডা হয়েছে?বলেই আবার হাত ধরে ট্রেন থেকে নামিয়ে দিয়ে সোজা ফিরোজের বাসায়।
তারাতারি মালপত্র আর দুই বোতল পানি নিয়ে ভাবির পিছে পিছে বের হয়ে সামনে পার্ক করে রাখা গাড়িতে বসল। ড্রাইভিং সিটে ভাবি, তার পাশে ফিরোজ আর পিছনে মনিরার পাশে রাশেদ সাহেব। ভাবি বসে ম্যাপটা দেখে ফিরোজের সাথে রাস্তা সম্পর্কে কি কি যেন আলাপ করে নিল। পিছনে তাকিয়ে ফিরোজ জিজ্ঞেস করলো ওখানে আমি কখনো যাইনি,
কাছে গেলে তুমি চিনতে পারবে তো?
হ্যাঁ আমি এই না এক বৎসর আগেই এসে গেলাম। আশা করি ভুলে যাই নি। তাছাড়া তোমাদের দেশ কি আর আমাদের দেশের মত?এখানে রাস্তায় কত সাইন দেয়া আছে না?তাই দেখেই তো যেতে পারবে, আর তুমি এত চিন্তা করছে কেন, মাস্টারনির পাশে বসে তোমার এতো চিন্তা কিসের?দেখি রোড ম্যাপটা দেখি।

ম্যাপটা নিয়ে খুজে পেয়ে বলল গত বার হিথ্রো থকে যখন গিয়েছিলাম তখন এম ফাইভ দিয়ে যায়নি, সম্ভবত এম ফোর দিয়ে গেছে। এম ফাইভ গেছে স্ট্রাউডের উত্তর দিয়ে, এইতো গ্লস্টার শায়ার, ওখানে কাছে গেলেই আমি চিনব। চল। ভাবি চলেন। শেফালী গাড়ি ছেড়ে দিল। শহর থেকে বের হয়ে এম ফাইভ ধরে নব্বই পঁচানব্বই মাইল বেগে চালিয়ে ঘন্টা খানিকের মধ্যেই রাশেদ বাম দিকে স্ট্রাউডের সাইন দেখে বলল
ভাবি দেখেছেন? স্ট্রাউড বাম দিকে।
হ্যা ভাই দেখেছি।
তাহলে আর চিন্তা কি এগিয়ে চলেন। ভাবী, ভাগ্য ভাল যে আপনি চালাচ্ছেন, না হলে ইশারায় ফিরোজকে দেখিয়ে বলল এই মিয়া যে কোথায় নিয়ে যেত কে জানে।


[যত দিন পর্যন্ত রাশেদ সাহেব তার ভাগ্যের আকাশে নিলীমার দেখা না পাবে তত দিন ধরে চলবে। এ পর্যন্ত তার সাথে থাকুন এবং আপনার কিছু ভাল লাগা বিলিয়ে দিন রাশেদ সাহেবের জন্য। ]

No comments:

Post a Comment

Thank you very much for your comments.