Saturday, 8 December 2012

নক্ষত্রের গোধূলি-৫৮ [অধ্যায় ৬]

[পূর্ব প্রকাশের পরঃ নক্ষত্রের গোধূলি-৫৭]
টিউব থেকে অল্ডগেট ইস্টে নেমে সোজা চলে গেলেন ব্রিকলেনে একটা জব সেন্টারে। ক্ষুধায় রীতি মত পেট জ্বলছে ওদিকে তার সাথে আছে জানুয়ারির শীত। গায়ে যথেষ্ট শীতের কাপর থাকলে কি হবে মনে যখন শক্তি থাকে না তখন হাজার গরম কাপরেও শীত দূরে
যেতে চায় না। এমনিতেই সে ক্ষুধা সইতে পারেনা তারপর আবার ডায়াবেটিকের রুগী। ক্ষুধা লাগলেই রীতিমত শরীর কাঁপে। না, আগে কাজের খোঁজ নিয়ে নেই তার পর খাওয়া যাবে। এর আগে যেখানে গিয়েছিলেন তার কোনটায় না। এবারে অন্য আর এক সেন্টারে। পরে জেনেছে এটা নাকি এখানকার বেশ পুরনো এবং নাম করা জব সেন্টার। নতুন অফিস, এর আগে এখানে আসেনি তাই একটু দ্বিধা সংকোচ নিয়ে কাচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে দেখে সামনের টেবিলের এপাশে কোট গায়ে এক ভদ্রলোক বসে আছে। ওপাশে ভিতরের চেয়ারে কেও নেই। পাশে রিসিপশনের মত লম্বা কাউন্টার টেবিলের ওপাশে একজন তার সামনে দাঁড়ানো লোক জনের সাথে কথা বলছে। রাশেদ সাহেব দাড়িয়ে কিছুক্ষণ তাদের কথাবার্তা শুনলেন। সে যে উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে সেই ধরনের কথা হচ্ছে। কাজকর্ম কেনা বেচা হচ্ছে। অপেক্ষায় রইলেন। একটু পরে তার ডাক এলো,
কি ভাই আপনি কি চান?
আমি সামনের একটা কাজ খুঁজছি, আছে?
আপনার অভিজ্ঞতা কত দিনের?
প্রবীণ ছত্রির থিউরি আর বিয়ার দিয়ে গোসল করার অভিজ্ঞতা মিলিয়ে বললেন
ছয় মাস।
আছে, আপনি একটু অপেক্ষা করেন আমি ডাকবো।
ভাবল, তাহলে এই ফাঁকে কিছু খেয়ে আসি,
আচ্ছা তাহলে আমি আধা ঘণ্টা পরে আসি?
হ্যাঁ ঠিক আছে আধা ঘন্টা পরেই আসেন।
কাউন্টার ছেড়ে বেরিয়ে আসার পথে ওই যে ঢুকে প্রথমেই কোট গায়ে যে লোককে চেয়ারে বসা দেখেছিল তার চোখে চোখ পরল। সে তাকেই দেখছিল আর অমনিই তাকে বাইরে আসার জন্য ইশারা করে বের হয়ে এলো। বেরিয়ে এসে পিছনে ঘুরে দেখে সেই লোক বেরিয়ে আসছে।

আমি কোট গায়ে আপনাকে দেখে বুঝেছি আপনি এখানকার স্থানীয় নন। এখানে কেও সাধারণত কোট গায়ে দেয় না। জ্যাকেটই এখানে বেশি চলে তাই ভাবলাম দেখি একটু আলাপ করে। আমি রাশেদ, বাড়ি ঢাকা, গত অক্টোবরের শেষে এসেছি বর্তমানে রেস্টুরেন্টে কামলা দিচ্ছি, আপনি?
আমি নাসির, আমার বাড়িও ঢাকা।
পরবর্তী আলাপে জানা গেল সে এখানে টুরিস্ট হিসেবে এসেছে, কিছু দিন কাজ করম করে যাতায়াতের টাকাটা যা পারে তুলে নিয়ে দেশে ফিরে যাবে। পেশায় গ্রাফিক্স ডিজাইনার, ঢাকায় নিজের ব্যবসা আছে। আপাতত ছোট ভাই সেটা দেখছে। এই জব সেন্টারে কাজের সন্ধানে এসেছে। মালিকের সাথে কথা হয়েছে। সে বলেছে কম্পিউটার সম্পর্কে জানে এমন একজন লোক দরকার। তাই অপেক্ষা করছে। গত কাল বিকেলে ঘণ্টা দুয়েক বাংলা কম্পোজ করিয়েছে আর ছোট একটা ডিজাইন করিয়েছে।

রাশেদ সাহেব বললেন
আরে ভাই এরা আপনাকে দিয়ে শুধু কাজ করিয়ে নিবে পয়সা দেবেনা। এখানকার মানুষদের আমার হাড়ে হাড়ে চেনা হয়ে গেছে। দেশে আপনার অবস্থা যাই থাকুক আমরা তৃতীয় বিশ্ব বলেন আর গরীব দেশ বলেন সেখান থেকে মূলত অভাবের কারণে অসহায় হয়েই এখানে আসি আর এরা আমাদের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নেয়। এই যে কাল আপনি যা করেছেন সেটা যদি এখানকার স্থানীয় কাওকে দিয়ে করাত তাহলে তাকে অন্তত পঞ্চাশ পাউন্ড দিতে হত। আপনাকে কত দিয়েছে?
না, কিছুই দেয়নি এমনকি এক কাপ চাও খাওয়ায় নি। আমি বাইরে গিয়ে চা খেয়ে এসেছি।
তাহলে আপনি কি করে ভাবছেন আপনাকে হাজার পাউন্ডের কাজ দিবে? এদেশে আমাদের মত মানুষদের একটাই কাজ আর তা হোল রেস্টুরেন্টের কাজ। থাকা খাওয়ার কোন চিন্তা নেই। সপ্তাহ শেষে কাজের বিনিময়ে রানির মাথার ছবি সহ নগদ কিছু পাউন্ড পাবেন, যা পাবেন তাই লাভ।

আমি তাই করছি। আমি গত সন্ধ্যায় রওয়ানা হয়ে এই মাত্র স্কটল্যান্ড থেকে আসলাম। এখন এখানে একটা কাজ খুঁজতে এসেছি। যা বলেছে মনে হয় শুনেছেন, বলেছে আধাঘণ্টা পরে আসতে। এই ফাঁকে নাস্তা সেরে আসার জন্য বের হচ্ছিলাম আপনাকে দেখে মনে হল এই দেশের গতানুগতিক বাঙ্গালি নন তাই ইশারা দিয়ে এলাম আলাপ করার জন্য।
আপনি নাস্তা করার জন্য যাচ্ছেন, কিছু মনে না করলে আমার সঙ্গে বেশ অনেক খাবার আছে খেতে পারেন!
আপনার সাথে খাবার আছে মানে কি?
মানে হল আমার স্ত্রী আর ছেলে এসেছিল আমার সাথে, ওরা আজ চলে গেল আমি ওদের হিথ্রো এয়ারপোর্টে উঠিয়ে দিয়ে এখানে এসেছি। ওদের খাবার জন্য যা নিয়ে বের হয়েছিলাম তা ওরা সব খেতে পারেনি, রয়ে গেছে।
বলে হাতের ব্যাগ দেখাল,
এই যে এখানে।
চলেন এক জায়গায় বসে কথা বলি আর আপনি খেয়ে নেন।
রাশেদ সাহেব হঠাত এই রকম একজন সদ্য পরিচিত কারো খাবার খেতে একটু সংকোচ বোধ করছিলেন। সম্ভবত নাসির সেটা বুঝতে পেরেছে।
দেখুন আলাপ যখন হল আমরা একই পথের পথিক তাহলে আর আপনি এতো সংকোচ করছেন কেন?
চলুন ওইতো এই বিল্ডিঙের পাশে ওই সিঁড়ির নিচের বেঞ্চে বসি। আপনি সারা রাত জার্নি করে এসেছেন ক্ষুধা লেগেছে। খেয়ে নেন তারপর চলেন একটু চা খাই। এখানে এই শীতের মধ্যে বেশিক্ষণ থাকা যাবেনা।
চলুন,
বলে এগিয়ে কাঁধের ব্যাগটা বেঞ্চে নামিয়ে রেখে একটু আড়াল করে বসে পরলেন।
নাসিরও বসে হাতের ব্যাগ খুলে একটা কন্টেইনার বের করে দিল তাতে মাখন মাখানো ব্রেড, ডিম ভাজি আর একটু আলু ভাজি, এই পরিবেশে অপূর্ব বাঙালি নাশতা। দেশে ছেড়ে আসার পর এই নাশতা চোখে দেখেনি। এগুলি দেখে অনেক কথা মনে হল আবার তা ঝড়ের মত উড়েও গেল। সব সময় সব কিছু মনে করতে নেই।
নাসির বলল
পানি তো নেই যা ছিল ফুরিয়ে গেছে।

ভাবতে হবেনা, আমার সাথে পানি আর জুস আছে
বলে ব্যাগ খুলে জুসের প্যাকেট নাসিরের হাতে এগিয়ে দিলেন। নিজে পানির বোতল পাশে নামিয়ে রেখে কন্টেইনারটা হাতে নিয়ে খেতে শুরু করলেন। খেতে খেতে কথা হচ্ছে।
দেশে আপনি যাই করেন না কেন এখানে তার কোন কদর নেই। হ্যাঁ থাকতো যদি আপনার ওয়ার্ক পারমিট থাকত। এখন হয়ত খুঁজলে আপনার যোগ্য কাজ পাবেন কিন্তু থাকার জায়গা, খাওয়া দাওয়া এসব কিভাবে চলবে? আপনাকে তো উপযুক্ত পয়সা দেবেনা! খুব বেশি হলে সপ্তাহে একশ পাউন্ড দিবে এ দিয়ে ঘর ভারা, যাতায়াত আর খাবার এসব ম্যানেজ করবেন কিভাবে? কাজেই ওসব চিন্তা বাদ দিয়ে চলেন দেখি কোন রেস্টুরেন্টে কাজ পান কিনা। আমার মনে হয় এতেই ভালো হবে।

আমি যে রেস্টুরেন্টের কাজ কিছুই জানিনা।
আরে আমিই কি জানতাম আমার ঘটনা শুনবেন?
হ্যাঁ বলেন শুনি।
রাশেদ সাহেব মনিকে হিথ্রোতে বিদায় দেয়া থেকে আজ সকালে ভিক্টোরিয়া নামা পর্যন্ত সব খুলে বলল।
এখন বুঝেছেন? আপনি প্রথমে কুমি ওয়েটারের কাজ নিবেন আগে থেকে কিচ্ছু জানার দরকার নেই কাজে গিয়ে শিখে নিবেন। কথায় আছে না যেখানে ঠেকবেন সেখানে শিখবেন। কোথাও না ঠেকলে কিছু শেখা যায়না।
রাশেদ সাহেবের খাওয়া শেষ। বোতল থেকে পানি খেয়ে তামাকের প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট বানিয়ে নাসিরের দিকে এগিয়ে দিলেন।
না ভাই আমার চলে না।
ও আচ্ছা বেশ ভাল।
নিজেই জ্বালালেন। আয়েশ করে সিগারেট টানছিলেন আর ভাবছিলেন যাক অন্তত কিছু দিনের জন্য হলেও একজন সঙ্গী পাওয়া গেল, সিগারেট শেষ। উঠে দাঁড়ালেন,
চলেন দেখি একটু চা কোথায় পাই।
দুই জনে হাটতে হাটতে ব্রিকলেনের সোনালি ব্যাঙ্ক ছাড়িয়ে সামনে হোয়াইট চ্যাপেলের দিকে এগিয়ে ডান পাশে একটা দোকান থেকে কাগজের কাপে দুই কাপ চা নিয়ে আবার সেই জব সেন্টারের দিকে ফিরে এলেন।
কি নাসির সাহেব কিছু সিদ্ধান্ত পেলেন?
আমাকে সাহেব বলার দরকার নেই আমি আপনার অনেক জুনিয়র আমাকে তুমি বলেন ভালো লাগবে।
বেশ তাই হবে, তা কিছু পেলে?
হ্যা পেয়েছি।
কি পেলে?
আপনি আমার আগে এসেছেন এবং এসেই এর মধ্যে বেশ অনেক কিছু দেখে ফেলেছেন কাজেই আমার মনে হয় আপনি যা বলছেন তাই ঠিক। চলেন দেখি আমার জন্য কোন কাজ পাই কিনা।
হ্যা ঠিক বলেছেন চলেন।
আবার জব সেন্টার। কাউন্টারের সেই ভদ্রলোকের সামনে যেতেই লোকটা বলল
আপনাকে খুঁজছি আমি।
আমি একটু নাস্তা করে এলাম। স্কটল্যান্ড থেকে এসেছিত ক্ষুধা লেগেছিল, বলেন কি খবর পেলেন।

আপনার একটা কাজ আছে একটু দাঁড়ান আমি ফোন করছি বলেই ফোনের নম্বর ঘুড়িয়ে
হ্যালো, হ্যা আপনারা একজন লোক খুঁজছিলেন তা এই নেন ইনার সাথে কথা বলেন।
সালাম, ওয়ালায়কুম সালাম ইত্যাদি সেরে গতানুগতিক যা যা এপক্ষ ওপক্ষ বলা বলি করে তাই হল। যা বলল তাতে বুঝলেন ওবানের চেয়ে বেতন কিছু বেশিই দিবে।
কবে আসতে পারবেন?
কবে আসতে হবে?
কাল আসতে পারবেন?
ভাব দেখাবার জন্য একটু সময় নিয়ে বললেন
হ্যাঁ পারা যাবে তবে আপনার ঠিকানা, ফোন নম্বর, কিভাবে কোথায় নামবো একটু বলবেন?
হ্যাঁ ঠিকানা ফোন নম্বর ওনার কাছেই পাবেন আর আমাদের রেস্টুরেন্ট হল সাউথ ওয়েলসের ব্রিজেন্ডে। আপনি ভিক্টোরিয়া থেকে ব্রিজেন্ডের টিকেট করে সোয়ানসীর কোচে উঠবেন কিংবা ট্রেনেও আসতে পারেন। আচ্ছা ভাই আমার নাম আসিয়াদ আলি আপনার নামটা জানতে পারলাম না।
ও হ্যাঁ, আমার নাম রাশেদ, বাড়ি ঢাকা।
তাহলে রাশেদ ভাই কাল আসছেন?
হ্যাঁ আসিয়াদ ভাই আশা করছি কাল দেখা হবে,
এই পর্যন্ত বলে রিসিভারটা কাউন্টারের ওপাশের লোকের হাতে ধরিয়ে দিলেন। সে তার প্রয়োজনিয় কথা সেরে ওখানকার ফোন নম্বর ঠিকানা মালিকের নাম ইত্যাদি লিখে দিল। রাশেদ সাহেব পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে বিশ পাউন্ডের একটা নোট বের করে হাতে দিলেন। উনি নোটটা একটু দেখে বলল
ভাই এটা তো স্কটিশ পাউন্ড! আর কোন নোট নেই?
হ্যাঁ, আমি স্কটল্যান্ড থেকে আসছি আমার কাছে এটাই থাকবে। এই যে দেখেন সবই স্কটিশ নোট। অসুবিধা কি ভাই, ওখানে দেখেছি ইংলিশ আইরিশ সব নোটই চলে। কেউ কিছু বলেনি। এগুলি সবই বৃটিশ পাউন্ড। আমি কোন সমস্যা দেখছি না, সকালে টিউবে টিকেট করেছি কিছু বলেনি।
না, আসলে এখানে এই নোট বাজারে নিতে চায়না।
নি্তে না চাইলে ব্যাঙ্ক থেকে চেঞ্জ করে নিবেন। আমি আর কিছু দিতে পারছিনা। আমার কাছে যা আছে সবই স্কটিশ আর আইরিশ নোট। ইংলিশ নোট এই যে মাত্র দশ পাউন্ড আছে নিবেন, দশ পাউন্ডে হবে?
আচ্ছা থাক, যা আছে তাই দেন।
নোটটা দিয়ে বললেন
আচ্ছা ভাই, এই যে আমার এই বন্ধুর জন্যে একটা কাজ হবে? উনি কিন্তু একেবারে নতুন।
হ্যাঁ আছে, ডিডকোটে একটা কাজ আছে তবে বৃহস্পতিবারে যেতে হবে। পারবেন?
নাসির এগিয়ে বলল
আজ মঙ্গলবার, মানে পরশু যেতে হবে? হ্যাঁ পারব।
তাহলে আপনি কাল সকালে আসেন।

শুরু হল রাশেদ সাহেবের আর এক অধ্যায়। চলুন দেখি তার ভাগ্য তাকে আবার কোথায় নিয়ে যায়!

No comments:

Post a Comment

Thank you very much for your comments.