Sunday, 25 November 2012

নক্ষেত্রের গোধূলি- ১৭ [২য় অধ্যায়]

 [পূর্ব সূত্রঃ নক্ষত্রের গোধূলি-১৬ [২য় অধ্যায়]
ওইসব শহরের নানা গল্প বলছিলেন। তার কোনটা মনিরার কানে যাচ্ছে কোনটা যাচ্ছে না। সে শুধু অবাক হয়ে রাশেদ সাহেবের মুখের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছে। মনে হচ্ছে যেন তাকে এই প্রথম দেখছে।]


কুয়ালালামপুর থেকে লন্ডন দীর্ঘ চৌদ্দ ঘন্টার পথ। কম না। মাঝে দুই বার খাবার দিয়েছে, দুই বার হালকা নাশতা আর চা কফি বা পানীয় তো আছেই। যে যখন যা চাইছে। রাশেদ সাহেব মনিরা কে জোর করে বার বার পানীয় দিচ্ছে যাতে ডি-হাইড্রেশন হয়ে এয়ার সীকনেসে না ধরে। মাঝে মাঝে উঠে এলি ওয়েতে হাঁটা হাটি করতে বলছে নিজেও করছে। রাশেদ সাহেবকে যেন আজ মনিরার কাছে নতুন লাগছে। এর আগেও তো কত বার প্লেন জার্নি করেছে তখন তো এতো এমন করেনি, এ যেন অন্য কোন নতুন রাশেদ সাহেব।

মনিরার ভাবনা শুধু একটাই, যে জন্য আসা তার কতটা কি হবে, কোন কাজকর্ম পাবে কি না, কি করবে, মনি যখন চলে যাবে তখন এই আত্মভোলা মানুষটা কি ভাবে থাকবে, কি করবে এই সব সাত পাচ ভেবে নানা আশঙ্কায় মনিরার মন বিষণ্ন হয়ে রয়েছে। না কি আবার দেশে ফিরে যেতে হবে। এমন যদি হয় তাহলে কি উপায় হবে, নানা কিছু। আবার এটাও ভাবছে দেশ ছেড়ে যখন বের হয়ে এসেছে নিশ্চয়ই একটা গতি হবেই। এতো বড় এই ইংরেজদের রাজ্যে কি ওর জন্য একটা কাজও জোগার হবে না?নানা কিছু ভাবতে ভাবতে আশা নিরাশার অনিশ্চয়তা আর গতরাতের অনিদ্রায় ক্লান্ত হয়ে মনিরা ঘুমিয়ে পরেছে।

রাশেদ সাহেব ওর মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে আর ডাকতে পারলো না। কাত হয়ে থাকা মনির মাথাটা টেনে নিজের বুকে এনে নিলেন, মনি একটু কাত হয়ে রাশেদ সাহেবের বুকে ঘুমাচ্ছে। মনির মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলেন সে কত সুখী। মনির মত স্ত্রি পেয়েছে। যে তার সমস্ত সত্তা দখল করে রয়েছে, ওকে ছাড়া একটা দিন তো দূরের কথা একটা বেলাও চলে না। তার মনের কথা গুলি কেমন করে যেন সব ঠিক ঠিক বুঝে ফেলে। অবাক লাগে। ভালবাসা কি এমনই গভীর?কত গভীরে গেলে এমন হতে পারে?কই আমি তো পারি না! ভাবতে ভাবতে সেও এক সময় ঘুমিয়ে পরে। হঠাত্ মাইকে এয়ার হোস্টেজের কণ্ঠে চমকে উঠলেন, প্লেন অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই হিথ্রো এয়ারপোর্টে নামবে, সেখানকার তাপ মাত্রা দুই ডিগ্রী এবং আবহাওয়া সম্পর্কে জানিয়ে যাত্রীদের সেই অনুযায়ী পোষাক পরে নেবার কথা জানিয়ে সীট বেল্ট বেধে নেবার অনুরোধ জানালো। মনিরার ঘুম তখন ভাঙ্গে নি। রাশেদ সাহেব আস্তে করে ডাকলেন, মনি ওঠ, লন্ডন এসে গেছে। মনির সীট বেল্ট বেধে নিজেরটাও বেধে নিলেন।

আবার ডাকলেন মনি ওঠ।
মনি চোখ মেলে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো, কি হয়েছে?
লন্ডন এসে পরেছি প্লেন নামছে।
মনি জানালা দিয়ে দেখল। ছবির মত সাজান সুন্দর বাড়ি ঘর, টেমস নদী, আই অফ লন্ডন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। একটা ঝাঁকুনি দিয়ে প্লেনের চাকা মাটি ছুঁয়ে গেল। একটু পরেই প্লেন হিথ্রো আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের তিন নম্বর টার্মিনালের সামনে থেমে গেল। রাশেদ সাহেব ব্যগ থেকে মনির গড়ম কাপড় বের করে মনিকে পরিয়ে দিলেন, পায়ে মুজা বদলে গরম মুজা পরিয়ে দিলেন, এছাড়া হ্যান্ড গ্লোভস আর গলার মাফলার মনির হাত ব্যাগে ভরে দিলেন।

গ্যাং ওয়ে টেনে প্লেনের দরজার সামনে আনতে দরজা খুলে দিল। যাত্রীরা একে একে সবাই নেমে গেল। টার্মিনালের দোতলার উপর বেশ অনেকটা পথ হেটে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে বেশ দীর্ঘ কিউর পিছনে। তাদের পালা এলে কাল ইমিগ্রেশন অফিসার তাদের পাসপোর্ট দেখে সীল দিয়ে ফেরত দিয়ে দিল। রাশেদ সাহেব এক হাতে ব্যাগ আর অন্য হাতে মনিরার হাত ধরে লাগেজ কনভেয়ারের কাছে এসে দাঁড়ালো। ওদের মালামাল কোন বেল্টে আসছে তা মনিটরে দেখে নিয়ে সেখানে যেয়ে দাঁড়ালেন। ওদের মাল আসতেই বেল্ট থেকে নামিয়ে কাস্টমের সবুজ গেট দিয়ে বেরিয়ে এসে বাইরে যেখানে যাত্রীদেরকে রিসিভ করার জন্য সবাই এসে অপেক্ষা করে সেখানে এসে ফিরোজকে খুঁজে না পেয়ে মনিরাকে বললো তুমি এখানে এগুলি নিয়ে বসে থাক আমি ফিরোজকে খুঁজে বের করি। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও ফিরোজকে না পেয়ে আবার মনির কাছে ফিরে এলেন।

মনি জিজ্ঞেস করল, পেলে না?
দেখছি না।
তাহলে কি আসে নি?
না আসলেও আসবে।
তুমি কি ঠিক ভাবে জানিয়েছিলে?
কি যে বল, তারিখ, ফ্লাইট নম্বর, সময় সব জানিয়েছি। আমার মনে হচ্ছে ওরা রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামে আটকে রয়েছে।
এখানেও ট্রাফিক জ্যাম আছে নাকি?
থাকবে না মানে, এখন পুরো পিক টাইম। দাঁড়াও আর একটু দেখি, তারপর ফোন করি।
বলেই তিনি মনির পাশে বসে পরলেন।

আমার কিন্তু ভয় করছে আসবে কি না, যদি না আসে তাহলে কি করবে এখন?
কি যে বল তুমি আসবে না কেন, অবশ্যই আসবে। একটু অপেক্ষা কর।
প্রায় আধা ঘন্টা পার হয়ে গেল এর মধ্যে ওকে না দেখে এবার রাশেদ সাহেবও একটু চিন্তিত হলেন। উঠে গিয়ে দোকান থেকে সাথে থাকা পাউন্ডের একটা কয়েন ভাঙ্গিয়ে এনে ফিরোজের বাসায় ফোন করলেন।
ফিরোজের মেয়ে জানাল আব্বু আম্মু দুজনেই আপনাদের রিসিভ করতে চলে গেছে, আম্মু একটু বাইরে কাজে গিয়েছিল ফিরতে দেরি হওয়াতে দেরি হয়েছে।
আচ্ছা ঠিক আছে তা হলে আমি ওকে মোবাইলে ফোন করছি।

লাইন কেটে দিয়ে আবার মোবাইলে ফোন করে সরাসরি ফিরোজের সাথে কথা হোল।
হ্যা রাশেদ আমরা আসছি, তোমরা কি তিন নম্বর টার্মিনালে আছ?
হ্যা?
তাহলে ওখানেই থাক আমাদের আরো আধা ঘন্টা লাগবে।
সত্যি আধা ঘন্টার মধ্যেই ফিরোজ এসে ওকে খুঁজে পেয়ে বললো তারা তারি চল যেখানে গাড়ি রেখে এসেছি ওখানে বেশিক্ষণ রাখা যায় না। তারা তারি করে একটা ট্রলি এনে ফিরোজ সহ মালপত্র উঠিয়ে বাইরে এসে দেখে ফিরোজের গাড়ির ড্রাইভিং সিটে ওর স্ত্রী বসে আছে। ওদের দেখে নেমে এলো। এর আগে ফিরোজের স্ত্রীর সাথে দেখা হয়নি। দ্রুত পরিচয় পর্ব সেরে মাল গুলি গাড়ির পিছনে রেখে গাড়িতে উঠে বসার সাথে সাথেই ফিরোজের স্ত্রি শেফালি, চিটাগাং এর মেয়ে লিভারপুলে জন্ম এবং বেড়ে উঠা, গাড়ি স্টার্ট দিল। টার্মিনাল থেকে বের হয়ে এই সামান্য একটু হেটে গাড়িতে আসতেই মনিরা শীতে কেঁপে উঠলো।

ভাবী হিটার বাড়িয়ে দেন
হ্যাঁ ভাই দিচ্ছি। একটু রসিকতা করে বলল কি ভাবি আগুনের কাছে বসেও শীত লাগছে?
রাশেদ নিজের কোট খুলে মনির গায়ে জড়িয়ে দিল। একটু পরেই গাড়ি গরম হলে মনি একটু স্বস্তি পেল। ফিরোজ আর রাশেদ সাহেবের হাসি তামশা আর ওদের দুজনের আন্তরিকতা দেখে মনি অবাক হোল। এতো ঘনিষ্ঠ বন্ধু এরা! হিথ্রো এলাকা ছাড়িয়ে এসে গাড়ি মটর ওয়ে ধরে ওদের বাড়ির দিকে চলছে। ভাবী গাড়িও চালাচ্ছে আবার ফাকে ফাকে কথাও বলছে। মনিরা ওদের এই সব কাণ্ড দেখে একটু নিশ্চিন্ত হয়েছে, মুখে হাসির আলো দেখা যাচ্ছে। প্রায় ঘন্টা খানিক ড্রাইভ করে রাত আটটার দিকে ওদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো।

ফিরোজের নিজের বাড়ি। বাড়িতে মা, বোন, বোন জামাই আর ওদের দুই মেয়ে এক ছেলে নিয়ে ফিরোজের সংসার। মালপত্র নামিয়ে ভাবি দোতলায় ওদের জন্য বরাদ্দ করা ঘরে রেখে এসে বসার ঘরে বসল।
ফিরোজের মা বললো তোমাদের বড় মেয়ে ফোন করেছিল। তোমরা পৌঁচেছ কি না জানতে চেয়েছিল, ওদের একটা ফোন করে জানিয়ে দাও, চিন্তায় আছে।
ফিরোজ উঠে গিয়ে লাইন ধরে দিল।

মনি কথা বলল, হ্যা মা আমরা এই মাত্র এলাম। তোমার চাচা চাচি দুজনেই গিয়েছিল, তোমরা কেমন আছ?আচ্ছা সাবধানে থেক, রাখি তাহলে।
বাড়ির সবার সাথে আলাপ পরিচয় হবার পর
শেফালি ভাবি এসেই বলল ভাবী কাপড় বদলে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নেন, আমার মনে হয় গোসল করলেই ভাল হবে। আপনার রুমের পাশেই বাথরুম। লম্বা জার্নি করে এসেছেন আজ আর বেশি কথা না, খেয়ে দেয়ে রেস্ট করেন কাল কথা হবে।
শেফালির আন্তরিকতা দেখে মনিরা একটু অবাক হোল। লন্ডনের মত শহরে যেখানে সব কিছু মাপা এমনকি মুখের হাসিটাও। মনিরা এ কয়দিন জেনে এসেছে সম্পুর্ণ অনিশ্চিতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছে সেখানে প্রথম দেখাতেই এমন আপন করে নেয়াতে মনিরার কাছে অবাক লাগারই কথা।
ভাবীর কথা শুনে ওরা দুই জনেই উঠে গেল।
মনিরা বললো সে গোসল করবে।
করে ফেল ভাল লাগবে, আমি হাত মুখ ধুয়ে নিলেই হবে।

স্যুটকেস খুলে মনিরা কাপড় বের করে গোসল করে এলো। রাশেদ হাতমুখ ধুয়ে এসে বলল
ওই যে ফিরোজের জন্য কাসুন্দি, ঝিটকার পিয়াজ আর ওগুলি এনেছি ওগুলি বের কর।
মনিরা ভাবল তাহলে ও আগে থেকে জানতো এখানে আসবে। আমাকে তো শুধু বলেছিল ফিরোজকে মেইল পাঠাবে, তা ওর এত ঘনিষ্ঠ বন্ধু অথচ এতদিন কিছু জানতে পারিনি, আমাকে তো কোনদিন কিছু বলে নি। যাক ওদের বন্ধুত্বের ভাব দেখে মনটা বেশ প্রফুল্ল হোল। ভাবতে ভাবতে সব কিছু বের করে একটা ব্যাগে ভরে নিচে নেমে এলো।

শব্দ পেয়ে ভাবী ডেকে বললো ভাবী এদিকে কিচেনে আসুন খাবার রেডি।
মনি এগিয়ে কিচেনে গিয়ে ভাবির সামনে ব্যাগটা নামিয়ে দিয়ে বলল এই যে ভাবী আপনার ভাই তার বন্ধুর জন্য এনেছে।
ওতে কি পিয়াজ আছে?
হ্যা।
আমি জানি পিয়াজ থাকতে হবে।
কেউ এলেই তার আর কিছু না, শুধু এই পিয়াজ আনতে বলবেই। যাক, ভাবী গোসল করেছেন মনে হচ্ছে!

হ্যাঁ ভাবী, গোসল করে ফেললাম।
ভাল করেছেন। কি, এখন শীত লাগছে?
না বেশ তো ভালই লাগছে।
নেন এবার খেয়ে দেয়ে শুয়ে পরুন।
শুনলাম আপনি এদেশে জন্মেছেন, এদেশে বড় হয়েছেন তা এত সুন্দর বাংলা বলেন আমার কাছে অবাক লাগছে।
ওমা, কি বলেন! এদেশে জন্মেছি বলে কি আমরা বাঙ্গালি না?
আপনাকে পেয়ে খুব ভাল লাগছে।

[আবার দেখা হবে যখন আকাশে উঠবে এক টুকরো নতুন বাঁকা চাঁদ, তেমনি কোন তারা ভরা রাতে। এ পর্যন্ত সুস্থ থাকুন, ভাল থাকুন আর সুখ স্বপ্নে মগ্ন হয়ে পরবর্তী পর্বের অপেক্ষা করুন। ধন্যবাদ]

No comments:

Post a Comment

Thank you very much for your comments.