Sunday, 25 November 2012

নক্ষত্রের গোধূলি-১১ [১ম অধ্যায়]

 [পূর্ব সূত্রঃ নক্ষত্রের গোধূলি-১০]
দেশে ফিরে এসে কোলকাতার ডাক্তারের দেয়া ঠিকানা খুঁজে ডাক্তারের সাথে দেখা করে প্রেসক্রিপশন আর তার চিঠি দেখালেন। ডাক্তার হিসেব করে তারিখ দিয়ে বলে দিলেন সেদিন নিয়ে আসার জন্য, এখানেই কেমোথেরাপি দেয়া যাবে। সব ভাই বোন, বৌ, জামাই, মেয়েদের ডেকে একত্র করে সবাইকে কঠিন মর্মান্তিক সংবাদটা জানিয়ে বলে দিলেন তোমরা মানসিক ভাবে প্রস্তুত থাকো।
যে যে ভাবে পার তার সেবা করার চেষ্টা কর আর সে যেন ঘুণাক্ষরেও কিছু বুঝতে না পারে এরকম অভিনয় করে যেও। বিলাতে ফোন করে ভাইকেও জানিয়ে দিল।

কয়েকদিন পর স্ত্রি আর মেয়েকে নিয়ে এসে সেও শেষ দেখা দেখে গেল। কেমোথেরাপি শেষ হলে চলল রেডিও থেরাপি। এক সময় এটাও শেষ হবার পর কি যেন কি একটা দামী ওষধ দেয়া হল। আত্মীয় স্বজনেরা নানা রকম খাবার এনে খাইয়ে দিয়ে শেষ দেখা করে গেল। বডি স্ক্যানের ছবিতে দেখেছে শরীরের প্রায় সব হাড় ঝাজড়া হয়ে গেছে। মায়ের ব্যাথা আর যন্ত্রণা যতটা সম্ভব চেপে রাখতে চাইতেন কিন্তু রাশেদ সাহেব তার মুখ দেখেই বুঝতে পারতেন কি যন্ত্রণা মা সহ্য করছেন। সারাক্ষণ বাড়িতে মায়ের কাছেই থাকতেন আর ভাবতেন হায়রে অর্থ! তুমি আমাকে ধরা দিলে না, আমি কি এতই ঘৃণ্য?তোমার জন্যই আমার মায়ের এই যন্ত্রণা আমাকে নিরূপায় হয়ে দেখতে হচ্ছে। বাড়িতে সারাক্ষণ ভীড় লেগেই আছে।

স্থানিয় ডাক্তারের দেয়া সব ধরনের চিকিৎসা শেষ হবার পর কোলকাতার সেই ডাক্তারের কাছে ফোন করে জানতে চাইল এখন কি করতে হবে। উনি সব শুনে বলে দিলেন সবই তো হয়ে গেছে এখন দেবার মত আর কিছু নেই।
এর দিন দুয়েক পরেই মায়ের অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। এই অবস্থায়ও নামাজ ছাড়েননি। সেদিন মাগরিবের নামাজের পর থেকেই শ্বাস কষ্ট দেখা দিল, বড় মেয়ে প্রেসার মেপে দেখল অসম্ভব রকম লো প্রেসার দেখা যাচ্ছে। ডাক্তারের সাথে ফোনে কথা বলে মনির শ্বাস কষ্টের ওষুধ নেয়ার মেশিন নেবুলাইজার দিয়ে ওষুধ দিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই শিয়রে বসা মনির কাছে পানি চাইলেন। কে যেন এক গ্লাস পানি মনির হাতে এগিয়ে দিলে মনি এক হাতে মাথাটা একটু উচু করে ধরে পানি খাইয়ে দিল। পানি খেয়ে মনিকে জোরে চেপে ধরে তার কোলে মাথা রেখে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। প্রান বায়ু উড়ে গেল, নির্বাক রাশেদ সাহেব পলকহীন চোখে তাকিয়ে দেখলেন।

মনি রাশেদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে হাতের পাখা নামিয়ে নিশ্চল পাথরের মত মার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ঘরে ফুল স্পিডে ফ্যান চলছিলো এ ফ্যানের বাতাস মায়ের যন্ত্রণা মুছে দিয়ে বা উড়িয়ে না নিয়ে প্রান বায়ুটাই উড়িয়ে নিয়ে গেল। বাবা, মনি সবাই হাত পাখা দিয়ে বাতাস করছিল। রাশেদ সাহেব বাবাকে বললেন ‘আব্বা হয়েছে আর বাতাস করতে হবে না’ বলেই হাত থেকে পাখাটি নিয়ে পাশে রেখে মায়ের মুখ চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন।
বাবা জিজ্ঞেস করলেন কি করছিস?
মনি অনেক কষ্ট করে শুধু এটুকুই বলতে পারলো তার আর বাতাসের প্রয়োজন নেই আব্বা।
ঘর ভর্তি আত্মীয় স্বজনদের কেউ কেউ ডুকরে কেঁদে ফেললেন।
রাশেদ সাহেব বাবাকে বললেন আমি একটা অন্যায় করেছি আব্বা আমাকে ক্ষমা করবেন, সব কিছু আমি জানতাম, সবাইকে বলেছি কিন্তু আপনাকে বলতে পারিনি। বাবা বললেন আমি বুঝতে পেরেছিলাম। সেঝ ভাই অফিসে, ছোট ভাই বাইরে গেছে। তাদের সবাইকে ফোন করে তারা তারি আসতে বললেন। বোনকে ফোনে জানালেন ওরা সবাই যেন যত তারা তারি সম্ভব এখানে চলে আসে। টেলি ফোন এক্সচেঞ্জের অপারেটরকে মৃত্যু সংবাদ দেয়ার কথা বলে জরুরী ভাবে কল বুক করলেন, প্রায় সাথে সাথেই লাইন পাওয়া গেলে বিলাতে মেঝ ভাইকে বললেন তোরা এখন কোথায় কি করছিস?

শুনে বললো আম্মা তো আর নেই।
কখন?
এইতো চার পাচ মিনিট আগে।
ও আচ্ছা তাহলে আপনারা সব ব্যবস্থা করে ফেলেন, আমি এখনই টিকেট বুকিং দিচ্ছি, পেলে সাথে সাথেই আসছি, তবে আমার জন্য দেরী করবেন না।
আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব সবাইকে ফোনে জানিয়ে দিলেন। ছোট ভাইদের বন্ধুরা সবাই এলো, তারাই সব ব্যবস্থা করে ফেললো। সবাইকে ভাগাভাগি করে কোরান খতম করার কথা বলে দিলেন। পরদিন মিরপুর বুদ্ধি জীবি গোরস্তানে রেখে আসার আগ পর্যন্ত রাশেদ সাহেব অবিচল ছিলেন। যা যা করতে হবে তা যাকে দিয়ে যা করা যায় সবই ঠিক ভাবে করেছেন। যাকে যাকে সংবাদ দেবার তা তিনি নিজেই দিয়েছেন। গোরস্তান থেকে ফিরে এসে সবার অলক্ষ্যে গ্যারেজের এক কোণায় গিয়ে একা বসে পরলেন। হঠাত্ করেই কান্না, সে কি কান্না, কোন পুরুষ মানুষ এভাবে কাঁদতে পারে এ এক বিস্ময়।

হঠাত্ ছোট মেয়ে দেখতে পেয়ে মাকে ডেকে নিয়ে এলো। মনি এসে মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে কোন ভাবে ওখান থেকে ঘরে নিয়ে এলো। মায়ের মৃত্যুর পরেই শুরু হোল রাশেদ সাহেবের অনন্ত পতন, একেবারে পৃথিবীর অতলে তলিয়ে যাবার যাত্রা আরম্ভ হোল তার।
সিনেমা আর কতক্ষণ চলতো জানিনা, হৃদয়হীন কোচটি ফকিরাপুল বাসস্ট্যান্ডে এসে থেমে গেল। কোচের সুপারভাইজার শেখানো তোতা পাখির মত মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের সাথে ভ্রমণ করার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাজধানী ঢাকা শহরে এসে তাদের যাত্রা পথের সমাপ্তি ঘোষনা করল। যাত্রীরা সবাই একে একে নেমে গেল রাশেদ সাহেবও তার ব্যাগটা খুঁজে নিয়ে কাধে ঝুলিয়ে কোচ থেকে নেমে গাবতলী গামী একটা লোকাল বাসে কল্যাণপুর নেমে ভোর হবার বেশ অনেক আগে রিকশা না পেয়ে হাটতে হাটতে তার বাবার তৈরী বাড়িতে যেখানে তাকে তার স্ত্রী সহ সন্তানদের আশ্রয় দিয়েছে, যেখানে তার মনি সহ তিন মেয়ে রয়েছে সেই বাড়ির সামনে এসে দেখলো এখনো কেউ ওঠেনি।

কলিং বেলের সুইচ টিপে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করতেই কলাপসিবল গেটের ফাকে মনির সদ্য ঘুম ভাঙ্গা হাসিতে উজ্জ্বল মুখটা দেখতে পেল। চাবি নিয়ে এসে গেটটি খুলে দিলে রাশেদ সাহেব ভিতরে ঢুকতেই মনিরা রাশেদ সাহেবকে জড়িয়ে ধরল, যেন কত যুগ ধরে সঞ্চিত কত বিরহের অবসান হয়ে মহা মিলন হোল।
কি করছ? চল ভিতরে যেয়ে নিই, মানুষে দেখবে তো।
দেখুক।
এই তো মাত্র দুই রাত আর এক দিন গেছে এর মধ্যেই এতো!
হু, আমার মনে হচ্ছে কতকাল তোমাকে দেখি না, কেমন আছ তুমি?
কাল সন্ধ্যায় না কথা হোল, ভালো না হলে রাত জেগে এলাম কি করে, তুমি তোমার মেয়েরা কেমন আছ?
সবাই ভাল। চল তুমি কাপড় বদলে নাও আমি গোসলের পানি গরম দিয়ে আসছি, তারপরে তুমি গোসল কর আর আমি নাশতা বানাই।
[প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত]

[আবার দেখা হবে পৌষের হিম ঝরা রাতে আমাদের এই রাশেদ সাহেবের রূপকথার গল্পের ২য় অধ্যায়ের আসরে। যে যেখানে আছেন সবাই এ পর্যন্ত সুস্থ থাকুন, ভাল থাকুন এবং সুখ স্বপ্নের সাথে পরবর্তী পর্বের অপেক্ষা করুন। ধন্যবাদ]

No comments:

Post a Comment

Thank you very much for your comments.