Sunday, 25 November 2012

নক্ষত্রের গোধূলি-১০ [১ম অধ্যায়]

 [পূর্ব সূত্রঃ নক্ষত্রের গোধূলি-৯]
রাশেদ সাহেবের মা হঠাৎ করেই মারা গেলেন। হঠাৎ করেই বলা যায়। বুকে এক ঘা হয়েছিলো যা তিনি নিজে অনুভব করছিলেন কিন্তু কাউকে কিছু বলছিলেন না। যখন ব্যাথা সহ্য করতে পারছিলেন না তখন এক দিন বড় বৌকে বললেন। মনিরা দেখে এসে তার স্বামীকে জানালেন। রাশেদ সাহেব শুনেই মায়ের কাছে এসে দেখতে চাইলেন। মা নিরূপায় হয়ে দেখালেন। দেখেই রাশেদ সাহেব বুঝলেন
‘ক্যান্সার’, তার মাথায় যেন বজ্রপাত হোল। মাকে বললেন একি!
আপনি কেন একথা এতদিন জানাননি?
মা নির্বাক। কোন কথা বলছেন না।
কেন চেপে রেখেছেন বলেন।
কি বলবো, তোর এই অবস্থা দেখছি ভাবলাম দেখি এমনিই হয় তো সেরে যাবে তাই বলিনি।

আমার অবস্থা দেখে আপনি বলেননি বেশ কিন্তু আপনার তো আরও ছেলে আছে তাদের অবস্থা তো আমার মত নয়।
ওদের কাছে কি আমি কখনো কিছু বলি?
তাই বলে এই সর্বনাশ করবেন? জানেন এর ফল কত ভয়ঙ্কর?
মা নিরুত্তর। পরিবেশ নিস্তব্ধ।
রাশেদ সাহেব জানেন মা এক তাকে ছাড়া আর কারো কাছে কিছু চাইতে পারে না, তাই বলে এর কি কিছুই মা বুঝতে পারেনি?তাকে বললে কি সে কিছুই করতে পারতো না?মায়ের জন্য কি তার কিছুই করার ছিল না? সে নিজে না পারলেও অন্তত তার ভাইদেরকে তো জানাতে পারত এবং সে জানে ভাইয়েরা চুপ করে বসে থাকতে পারতো না, অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে ত্রুটি করত না।

সব নিয়তি, আজ যদি আমার এ অবস্থা না হত তা হলে মা কিছুতেই এটা চেপে রাখতে পারতেন না। হায়রে অর্থ! হে মহান অর্থ! ওহে মহান, তুমি এতই উচ্চ শিখরে উঠে বসে আছ?হে সর্ব সমস্যার সমাধান, তোমার কাছে কি আমি এতই তুচ্ছ?তুমি আমাকে ধরা দিলে না, তোমার অভাবে যে আমার মা নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে চলে যাচ্ছে আর আমাদেরকে তাই বসে বসে দেখতে হবে, সময় মত তার চিকিৎসা করাতে পারলাম না, একি তুমি দেখতে পাচ্ছ না?তবুও তোমার এতো অহঙ্কার কেন?হায়রে পলাতক অর্থ, তুমি আমার মায়ের এই সময়েও পালিয়ে রইলে?আমি তোমার সাথে কোন অন্যায় করিনি, কোন অমর্যাদা করিনি, আমি তোমায় দিয়ে জুয়া খেলিনি, আমিত কোন নেশা করার জন্য তোমায় ব্যবহার করিনি, তোমার কোন অপব্যবহার করিনি। তাহলে কেন আমার থেকে দূরে রইলে? কেন আমার সাথে এই বঞ্চনা?

সেদিন অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল বলে আর কিছু করার ছিল না তবে রাশেদ সাহেব বাবাকে বলে রাখলেন সে যেন কালই মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যায়। মনিকে বলে রাখলেন কাল যেন সময় মত তাদের পাঠিয়ে দেয়। পর দিন ডাক্তার দেখেই বলে দিল যে ‘ব্রেস্ট ক্যান্সার’, বি লেভেলে চলে গেছে আপনি এতো দিন আসেননি কেন, এ তো এখনই অপারেশন করতে হবে। আপনারা টাকা পয়সা আর সবার অনুমতি নিয়ে কালই চলে আসুন। বাড়িতে ফিরে সবার সাথে আলাপ হোল।
রাশেদ আর তার ছোট ভাইয়ের বক্তব্য, না, অপারেশন করতে হলে কিছুতেই এখানে না, কোলকাতা গিয়ে করাতে হবে। এখন প্রশ্ন হোল সাথে কে যাবে?
বাবা সিদ্ধান্ত দিলেন সেঝ বৌ আর রাশেদ যাবে।
মা বেঁকে বসলেন। না, যেতে হলে বড় বৌকে ছাড়া আমি যাবো না।
এ বাড়ির সবারই পাসপোর্ট আছে কাজেই দেরী করতে হয়নি। মার কথা মত পর দিনই ভিসার জন্য সবার পাসপোর্ট পাঠিয়ে দেয়া হোল। তার পরের দিন ছোট ভাই গিয়ে পাসপোর্ট ভিসা সহ তিনটা টিকেট নিয়ে এলো। ওই দিনই রাতের কোচ। তার পর দিন কোলকাতার বেহালায় ঠাকুর পুকুর ক্যান্সার হাসপাতালে। ওরা সারা দিন এটা সেটা নানান টেস্ট ফেস্ট করে জানাল আগামী দশ দিন পুজার বন্ধ আপনারা এর পরে আসুন। রাশেদের পিলে চমকে গেল, বলে কি?এটাতো আর নিজের দেশ না, এখানে কিই বা করতে পারে।

হাসপাতাল থেকে বের হয়ে পাশেই একটা ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে উঠে গেল। মা আর মনিকে রেখে রাশেদ বের হয়ে গেল বেহালা বাজারে। বাজার থেকে মায়ের পছন্দের বাজার এনে দেখে এর মধ্যেই মনিরা ফ্ল্যাটের পাশের দোকান থেকে হাড়ি পাতিল কিনেছে আর গ্যাস সিলিন্ডার সহ একটা সিঙ্গেল বার্নার চুলা ভাড়া করে এনে মৃত্যু পথ যাত্রি শাশুড়ির জন্য রান্নার যোগাড় করে নিয়েছে।
রাশেদ বাজার নামিয়ে দিয়ে আবার বের হোল ফোন বুথ খোঁজার জন্য। বিলাতে মেঝ ভাইকে জানাতে হবে। তাকে বিস্তারিত জানিয়ে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কোথায় আছে খুজতে বের হোল। আশে পাশের দোকান, লোকজনের কাছে জিজ্ঞেস করে সন্ধান পাচ্ছে না এমন সময় একজনের সাথে আলাপ হোল যার পূর্ব পুরুষ বাংলাদেশ থেকে এ দেশে এসেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষ শুনে নিজেই এগিয়ে এসেছেন, পেশায় ডাক্তার। সব শুনে সে সল্টলেকের এক ডাক্তারের ঠিকানা ফোন নম্বর দিয়ে বলে দিলেন উনি আমার শিক্ষক।

আপনি এখনি ফোন করে দেখুন উনি কি বলে। রাশেদ দেরি না করে একটু আগে যে বুথ থেকে ফোন করেছিলেন আবার সেখানে গিয়ে ফোন করলেন। ডাক্তার সাহেব নিজেই ধরেছেন, শুনে বললেন হ্যা ঠিক আছে আপনি সন্ধ্যা সাতটায় আসুন। ফোন রেখে মার ক্ষুধা লেগেছে ভেবে তার প্রিয় দৈ চিড়া নিয়ে এসে দেখে মনিরার রান্না প্রায় শেষের দিকে। মা দৈ খেতে চাইল না, বললো এই তো রান্না প্রায় হয়ে গেছে। একটু পরেই মনি খেতে দিল। রূপচান্দা মাছ ভাজা, ডাল আর ভাত। ভাত মুখে দিয়ে মা বৌকে কাছে টেনে নিলেন। নিজের দেশ ছেড়ে এসে তার নিজের হাতে ছাব্বিশ বছর ধরে গড়া বৌয়ের হাতের রান্না তার কাছে অমৃতের মত লাগছে তাই কান্না থামাতে পারেননি,
তুমি তো আসতে চাইছিলে না, তুমি না এলে আমাকে কে এই রান্না করে দিত?
না মা, আমি তো নিষেধ করিনি, আব্বাই তো রেখার নাম বলেছে।
খাবার শেষ করতেই বিকেল হয়ে গেল। অচেনা জায়গা, এখান থেকে সল্টলেক যেতে কতক্ষণ লাগে জানা নেই বলে একটু আগেই বের হোল। একটা ট্যাক্সি নিয়ে সোজা সল্টলেক ডাক্তার ঘোষের চেম্বার। ডাক্তার ঢাকার প্রেসক্রিপশন দেখলেন, রুগী দেখে রোগীকে পাশের ঘরে নিয়ে বসিয়ে আসতে বললেন। মনি মাকে নিয়ে পাশের ঘরে বসিয়ে এলো। ডাক্তার জানতে চাইলেন,
ইনি আপনার কি হয়?
মা।

তাহলে এতো দেরী করেছেন কেন, এখন বি স্টেজে চলে গেছে, এই লেভেলে চলে গেলে মাস ছয়েকের বেশি রাখা যায় না। আপনারা চাইলে আমি অপারেশন করতে পারি এতে আমার লাভ হলেও আপনাদের কোন লাভ হবে না।
শুনে রাশেদ মনি দুই জনেরই মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
উদ্বিগ্ন হয়ে মনি জিজ্ঞেস করলো তাহলে এখন কি করা যায়?আপনি বলে দিন কোথায় গেলে ভাল হবে সে যেখানেই হোক তা নিয়ে ভাববেন না, যত টাকা লাগে লাগবে।
দেখুন কার কাছে পাঠাবো বলুন, যদি অন্য কারো কাছে কোন ব্যবস্থা থাকতো তাহলে সেটা আমার কাছেও থাকতো।
রাশেদ কিছু বলতে পারছে না, শুধু একবার মনির দিকে আবার ডাক্তারের দিকে চেয়ে দেখছে।
মনি আবার বললো, তা হলে?
তা হলে এখন ওই কেমো থেরাপি, রেডিও থেরাপি এই সব দিয়ে যত দিন থাকে। আর দেরী করবেন না। আপনারা একটু বসুন আমি কেমো থেরাপি দিয়ে নিই। কেমো দেয়ার পর বললেন একটু বসুন দেখি কি অবস্থা হয়। আধা ঘন্টা পর বললেন এখন নিয়ে যান। তবে আপনারা কালই চলে যাবেন না। অন্তত তিন দিন এখানে থাকুন, কেমোর কোন সাইড এফেক্ট দেখা দেয় কিনা সেটা দেখতে হবে। তিন দিন পর এখানে আসার দরকার নেই যেখানে আছেন ওখান থেকে আমাকে ফোনে জানাবেন, যদি ঠিক থাকে তাহলে চলে যেতে পারবেন। এর পরে আর রোগীকে কষ্ট দিয়ে এখানে আসতে হবে না আপনাদের ঢাকাতেই আমার চেনা ডাক্তার আছে আমি ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি তাকে আমার এই প্রেসক্রিপশন দেখাবেন, আমি চিঠি লিখে দিচ্ছি উনি সেভাবে ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
ঠিকানা দেখে রাশেদ বললো এতো আমাদের বাড়ির কাছেই।

[আবার দেখা হবে পৌষের হিম ঝরা রাতে আমাদের এই রাশেদ সাহেবের রূপকথার গল্পের পরবর্তী আসরে। এতক্ষণ রঙ্গীন স্বপ্নে মগ্ন হয়ে রাঙ্গিয়ে তুলুন অনুপম সুন্দর শীতের সোনা ঝরা সন্ধ্যা। ধন্যবাদ]

No comments:

Post a Comment

Thank you very much for your comments.