Monday, 30 March 2015

বেলা শেষের গান-৩


৫।
দেখতে দেখতে এক এক করে অনেকদিন চলে গেল। ফাইনাল পরীক্ষা সামনে এসে হাজির। প্রতিদিন স্যারের বাসায় আসতে যেতে দীপা আর নিপার সাথে বেশ অনেকটাই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়েছে। রাতে শোবার পর একটু একটু ভাবনা এসে জড় হয়। কাকে বেশি ভাল লাগে বুঝে উঠতে পারে না। দীপা আর নিপার মনেও হাসানের জন্য একটু একটু করে

স্বপ্নের জোয়ার বইতে শুরু করেছে। সব ব্যাপারে দুই বোন একজনের কাছে আর একজন খোলামেলা হলেও হাসানের ব্যাপারে কেও কারো কাছে কিছু প্রকাশ করতে পারে না। কোথা থেকে যেন বিশাল এক দেয়াল এসে দাঁড়ায়। কেও সে দেয়াল  ডিঙ্গিয়ে যেতে পারে না। হাসানও কিছু বুঝে উঠতে পারে না।  পরীক্ষা যেদিন শেষ হলো সেদিন খাদিজা বেগম স্কুল থেকে বের হবার পথে হাসানকে বলে দিল আজ বেলা পড়ে গেছে অনেক দূরে যেতে হবে কাজেই আজ বাড়ি যেওনা কাল সকালে বাসা থেকে নাশতা খেয়ে বের হবে। তোমাদের রেজাল্ট হবে ডিসেম্বরের ২৭ তারিখে তার আগেই চলে এসো। মাথা নিচু করে আচ্ছা বলে বেরিয়ে এসেছে।
পরদিন সকালে যথারীতি হেডস্যারের বাসায় যেয়ে দেখে আগের মত আজ আর কেও টেবিলে বসে নেই। মনটা খারাপ হয়ে গেল। সিঁড়িতেই কিচ্ছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। এভাবে একা একা কোথাও দাঁড়িয়ে থাকা যায় না কোন না কোন ভাবনা এসে মনের সঙ্গী হয়ে যায়। এখন ওই দীপা আর নিপার ছায়া মনের সঙ্গী হলো। কে ভাল? কার জন্য মনটা কেমন করে বলতে পার? হাসান বোকার মত দাড়িয়েই রইল। কি বলবে কিছু ভেবে পাচ্ছে না। দেখতে নিপা বেশি সুন্দর কিন্তু বড্ড খিটখিটে, তার চেয়ে দীপা অনেক শান্ত, মোমের আলোর মত ম্রিয়, একাদশীর জোসনার মত স্বচ্ছ তুলতুলে। একটুতেই আঘাত পায়। কথাও বেশি বলে না, চুপচাপ থাকে । হেডস্যারকে দেখেছে কখনও ওর সাথে জোরে কথা বলেনা।  এমনি কত কি ভাবছে এমন সময় ম্যাডাম এসে ওকে দেখে অবাক। ওমা! তুমি দাঁড়িয়ে কেন, কখন এসেছ? তোমার দেরি দেখে ভাবছিলাম তুমি কি চলেই গেলে নাকি! এসো ভিতরে এসো। বলে গেট খুলে দিল। আস ভিতরে আস বলে এগিয়ে গেল, পিছনে দেখল হাসান আসছে কি না। আস! লজ্জার কি আছে, তুমিতো আমাদের ছেলের মতই। মাদুর পেতে বসিয়ে মুরগির মাংস দিয়ে খিচুরি খেতে দিয়ে পাশে বসে রইল। হাসানের উৎসুক দৃষ্টি কাউকে খুঁজতে চাইছিল কিন্তু লজ্জায় মাথা তুলতে পারছিল না। বাড়িতে স্যার বা দীপা নিপার কোন সারা না পেয়ে ভাবছিল ওরা হয়ত বাইরে কোথাও গেছে। একটু পরেই দেখল দীপা আর স্যার পিছনে নিপা বাইরে থেকে ফিরে আসল। যা ভেবেছিল তাই। নিপা বাড়িতে থাকলে বাড়ি এমন নীরব থাকত না।
এইযে হাসান তুমি কি আজকেই বাড়ি যাবে? জী স্যার এখনই যাব, আমি ব্যাগ গুছিয়ে রেখে এসেছি। এখান থেকে খেয়ে হলে গিয়েই বের হব ভাবছি। বেশ ভাল কথা, মায়ের কাছে যাবে এসো, সঙ্গে বইখাতা কিছু নিয়েছ? নিয়েছি। আচ্ছা তাহলে ২৭ তারিখের আগেই ফিরে এসো  আর যে অংকগুলি দেখিয়ে দিয়েছি সেগুলি করবে। এর মধ্যে হাসানের খাওয়া হয়ে গেছে। হাত ধোবার সময় বলল তাই আসব। হাত ধুয়ে পিছনে ঘুরে দেখে দীপা একটা গামছা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এগিয়ে দিল। দীপার মুখের দিকে একটু লাজুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে গামছা নিয়ে হাত মুছে আবার ওর হাতে ফিরিয়ে দিল।
তাহলে স্যার, ম্যাডাম আমি যাই? যাই না বাবা বলতে হয় আসি! এসো।

মানিকগঞ্জ থেকে সুতি পাড়া নেমে ৩/৪ মাইল পথ হেটে যেতে হয়। একা হাটা পথে কত কি ভাবনা ভাবছে আর হাঁটছে। কোথা থেকে যেন দিবা এসে সামনে দাঁড়ালো। হাসান একটু থমকে উঠে থেমে গেল। না কোথাও নেই! সামনে পিছনে ডাইনে বায়ে কোথাও নেই। ও তাহলে আমি ওর কথাই ভাবছিলাম? হ্যাঁ তাইতো ভাবছিলে! কেন, মনে পড়ছে না ঐযে প্রথম যেদিন হালকা আকাশী রঙের ফুল ছাপা ফ্রক গায়ে দেখেছিলে সেই ছবি তোমার মনে একে দিয়েছে, কে দিয়েছে জান? কে? তোমার মন! তুমিতো ওই ছবিই সবসময় ভাব। দুবোনকে আলাদা করতে না পারলে কি হবে দীপার কথাই যে সবসময় তোমার মনে আগে আসে! ভেবে দেখেছ? হ্যাঁ তাইতো!! কিন্তু! না না কোন কিন্তু নয় এই কথাই সত্য।কি জানি তাই হবে হয়ত। আবার একটু এদিক ওদিক দেখে হাটতে শুরু করল। এখনও অনেক পথ বাকি রয়েছে।

বাড়িতে পৌছতে প্রায় সন্ধ্যা হয় হয় ভাব। একটু পরেই গ্রামের ঘরে ঘরে বাতি দেখা যাবে। অঘ্রাণের সবুজ গ্রামে এর মধ্যে কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে একটু একটু শীত লাগছে। গ্রামের রান্না ঘর থেকে ওঠা  ধোয়া আর কুয়াশা মিশে চাদরের মত ঢেকে দিতে চাইছে। পথের পাশে ধনেপাতা, জৈন এসবের গন্ধ বেশ লাগছে কিন্তু সেদিকে মন দেয়ার মত অবস্থায় নেই। স্কুলের কাছেই দেখা যায় দেবেন্দ্র কলেজ, এই স্কুল ছেড়ে কবেই যে কলেজে ভর্তি হবে সে কথা ভাবাই এখন মূল কথা, দীপা নিপার কথা ভেবে কি হবে? ওদের নিয়ে ভাবার মত সময় এখনও আসেনি। দেবেন্দ্র কলেজে ভর্তি হব নাকি একেবারে ঢাকায় যাব? এই সব এলোমেলো ভাবতে ভাবতে কখন যেন বাড়ির পাশের পুকুরের পাড়ে এসে দাঁড়িয়েছে লক্ষ করেনি। মা পুকুরের ঘাট থেকে পানি নিয়ে উঠে আসছিল হাসানকে দেখে থমকে গেল হাতের বাসন পেয়ালা পাড়ে নামিয়ে রেখে দৌড়ে এসে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরল। বাবা তুই কখন এসেছিস, আমাকে ডাকলি না কেন? [চলবে]
[নওরোজ সাহিত্য সম্ভারের প্রকাশনায় আগামী ২০১৭ বই মেলায় প্রকাশের অপেক্ষায়।]

No comments:

Post a Comment

Thank you very much for your comments.