Saturday, 25 May 2013

মেছো ভুত




আমার বাবা যখন ঝিটকা হাইস্কুলের শেষ ক্লাসের ছাত্র তখন কোন এক শীতের বিকেলে আমার দাদি বলেছিল হ্যাঁরে বাদশা, কয়টা মাছ মাইরা আনলে রাইন্ধা দিতাম, রাইতে ভাত খাবি কি দিয়া, ঘরে কিছু নাই। মাতৃ ভক্ত আমার পিতাজি মায়ের আদেশ পেয়ে ভাবল এখন যেয়ে কাজ নেই রাতে ওই ভুসকুরার বিলে যাব। ওখানে পুকুরে অনেক কৈ মাছ
আছে। মাছ ধরার জন্য ধর্মজাল আর মাছ রাখার জন্য একটা খালই রেডি করে রাখল। বেলা ডোবার সাথে সাথে রওয়ানা হলে সন্ধ্যার অন্ধকার হবার পরপরেই অল্প সময়ে বেশি মাছ পাওয়া যাবে। কাউকে সাথে নেবার দরকার নেই শুধু শুধু ঝামেলা। বেহুদা কথা বলবে। যদিও ওখানে পুকুর পাড়ের পুরনো শেওড়া গাছে ভুতের বাসা এ কথা সবাই জানে। দিন দুপুরেও ওই পথে পারতপক্ষে কেউ যেতে চায় না। থাক ওতে কি হবে আমিতো আর ভুতের ভাগের মাছ আনতে যাব না! তাছাড়া ওরাতো প্রতিদিনই খায়।

বাড়ির এই কাজ ওই কাজ টুকি টাকি সারার আগেই বেলা তলিয়ে গেল আর বাবাও জাল খালই আর দিয়াশলাই, শাল পাতার বিড়ির প্যাকেট কোমরে গুজে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। বাড়ির পুব দিক দিয়ে নেমে সামনেই একটা মস্ত তেঁতুলগাছের নিচে দিয়ে তিন চার মিনিট সামনে এগিয়ে সৈয়দ আলির বাড়ি ডানে রেখে এগিয়ে গেলেই খোলা চক। চকের ভিতর দিয়ে আইল ধরে মনের আনন্দে গান গাইতে গাইতে এগিয়ে চলল। ভুসকুরা এসে পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখে নিল তার আগে আর কেউ এসেছে কিনা। দৃষ্টিটা একবার শেওড়া গাছের দিক থেকেও ঘুরে এলো।  না আর কেউ নেই। এর মধ্যেই অন্ধকার হয়ে এসেছে। ভালই হয়েছে। দেখা দেখি আর কেউ আসবে না। অন্ধকার যত গভীর হোকনা কেন তার একটু আলো থাকে। আকাশের তারা গ্রহ নক্ষত্র তাদের আলো ছড়িয়ে দেয় তারই কিছু এসে পরে এই পৃথিবীর উপর তাতে অন্ধকারের মাঝে কিছুক্ষণ থাকলেই ওই আলো দেখা যায় চোখ সেটা খুঁজে নিতে পারে। সেই আলোতে যতটা দেখা গেল বিশাল পুকুর বোঝাই কচুরি পানা, পাড় দিয়ে ছিটকি, মটমটি এবং নানান হাবিজাবি আগাছায় ভরা। এর মধ্যেই একটু ফাঁক খুঁজে নিয়ে হাঁটু পানিতে নেমে জাল পাতার মত কচুরি সরিয়া কিনারায় উঠে একটা বিড়ি জ্বালিয়ে ঘন ঘন কয়েক টান দিয়ে কচুরি পানা পরিষ্কার করা  ফাকা জায়গায় জাল ফেলল।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে এক টান দিল আর জাল তুলেই আমার পিতৃদেবের মন খুব খুশি হলো না। জালে কোন মাছ নেই। পরে ২য় টানেও কোন মাছ নেই। পরের টানে জাল খালি ওঠেনি, বেশ কয়েকটা কৈ চার/পাঁচটা হবে উঠেছে। এগুলি ধরে খালইতে রেখে আবার জাল ফেলে দাঁড়িয়ে আছে। এমন সময় তার মনে হলো কেউ পিছন থেকে খালই ধরে টানছে। খালইটা ডান হাতে টেনে পিছন থেকে সামনে এনে গামছা দিয়ে ঢেকে রাখল যাতে মাছ লাফিয়ে বেরিয়ে না যায়। কিছুক্ষণ পরে পরেই জাল তুলছে। ভাগ্য ভাল কোন টানেই জাল খালি আসেনি কম হলেও ৩/৪টা করে মাছ এসেছে তবে সব গুলি কৈ না, কয়েকটা ফলি এবং ট্যাংরা পুঁটিও আছে। এ ভাবে বেশ অনেকক্ষণ মাছ মেরে চলেছে। হটাত পুকুরের ওপাড়ে দৃষ্টি গেল আর দেখে এক টুকরা আলো মনে হচ্ছে কে যেন হারিকেন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভাবল তার মত কেউ মাছ মারতে এসেছে। মারুক আমার কি! এত্ত বড় পুকুর। একটু পরে লক্ষ করে দেখল জাল ফেলার কোন শব্দ নেই। এবার ডাকল এই কে, ওপাড়ে কে? না কোন জবাব নেই! বেশি ডাকাডাকি করল না। কথা বললে তার নিজেরই ক্ষতি। কিন্তু কোন জাল ফেলার শব্দ হচ্ছে না অথচ এখানে হারিকেন নিয়ে কি করছে লোকটা! এ পাড় আর পাড়ের মধ্যে দূরত্ব একেবারে কম না, ভাল দেখা যাচ্ছে না আর তা সম্ভবও না। ভাবতে ভাবতে হটাত একি? যে বাতিটা দেখা যাচ্ছিল সেটা কেমন করে কচুরি ভরা পুকুরের ওপর দিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে, প্রায় মাঝ বরাবর এসে আবার পুকুরের কচুরি পানার ওপর দিয়েই ওই ডানে শেওড়া গাছের দিকে চলে গেল! ও আচ্ছা! থাক তোর মত তুই থাক!

এবারের টানের মাছ রাখতে যেয়ে মনে হলো খালইতে মাছ কম  লাগছে! কি ব্যাপার? এতক্ষণে খালই প্রায় অর্ধেক হয়ে যাবার কথা! মাছ যায় কোথায়? দিয়াশলাই জ্বেলে দেখে হ্যাঁ তাইতো ফলি মাছ একটাও নেই পুটী মাছও নেই। তলা হাতিয়ে দেখে না কোথাও ভাঙ্গা নেই তাছাড়া ভাল খালই দেখেই এনেছে। উপরে গামছার ঢাকনি দেয়া হয়েছে। একটু পরে আবার খালই ধরে টানাটানি। এবার এক টানে পিছনে নিয়ে গেল।
কিরে খালই ধরে টানছিস কে?
নাকি সুরে, মাছ দে!
তোকে দেয়ার জন্য মাছ ধরছি? লাগলে ধরে খা
নাকি সুরে, মাছ দে তা না হলে কিন্তু পুকুর পাড়ের কাদায় পুতে রাখব!
কি পুতে রাখবি?
নাকি সুরে, তোকে

রাখ দেখি! আয় সামনে আয়! পিছনে লুকিয়ে রয়েছিস কেন?
বলেই জালের বাঁশ ছেড়ে বাবা ঘুরে দাঁড়ালেন
কিরে কোথায় গেলি আয়! মাছ নিবিনা? আমাকে পুতে রাখবি না?
নাকি সুরে, ভালয় ভালয় কয়টা মাছ দিয়ে দে, তারপরে বাড়ি ফিরে যা
বাড়ি যাব, আমি কি তোদের মত শেওড়া গাছে থাকি?
নাকি সুরে, তাহলে মাছ দে
মাছতো নিয়েছিস, ফলি পুটী সব কে নিয়েছে? আর কত নিবি?
নাকি সুরে, না আরও কয়েকটা পুটী আছে ওগুলি দিয়ে দে
নারে, পুটী মাছ ভাজা খুব মজা, তুই যদি চাস তাহলে আমার সাথে বাড়ি পর্যন্ত চল মা ভেজে দিলে তখন নিবি
নাকি সুরে, ধুর, আমি কাচা খাব
পুটী পাবি না নে একটা কৈ নে
নাকি সুরে, না কৈ মাছে মেলা কাটা
দেখ রাত হয়ে গেছে বিরক্ত করিস না আমাকে আমার কাজ করতে দে
নাকি সুরে ধমক দিয়ে, কি দিবি না?

এই চ্যালেঞ্জের মুখে বাবা এতক্ষণে ভয় পেলেন। আশে পাশে কেউ নেই, গ্রাম বেশ দূরে, আধা মাইলতো হবেই। এর মধ্যে অনেক সাহসের কাজ করে ফেলেছি আর না এবার বাড়ি যাই কিন্তু এটাকে সরাই কি করে? বাবার মনে হটাত বিড়ির কথা মনে হলো আর কোমরের ট্যাঁক থেকে বিড়ি বের করে ঠোটে ধরে দিয়াশলাই জ্বালাবার মুহূর্তেই হাতে কি যেন এক ঝাঁকুনি লেগে দিয়াশলাই পানিতে পড়ে গেল। বাবা আগেই ভয় পেয়েছিল একটু এবার ভাবছে কি করা যায়! অনেক মাছ! কিন্তু ভুতের নজর লাগা মাছ নিয়ে গেলে নিশ্চয়ই মা এই মাছ রান্না করবে না, ফেলে দিতে হবে। তার চেয়ে দুই একটা দিয়ে দি্বো! না থাক দেখি কি করে! একটু ভেবে, না থাক, বাড়ি ফিরে যাই যা ধরা হয়েছে যথেষ্ট হয়েছে।

বাবা জাল গুটিয়ে কোমর থেকে খালই খুলে হাতে নিয়ে বাড়ির পথে হাটা শুরু করল। কিছুদূর যাবার পর মনে হলো সেই আগের মত খালই টেনে ধরেছে। থেমে পিছনে ঘুরে দাঁড়াল। না কেউ নেই। আবার হাঁটছে। একটু পরে আবার সেই একই কাণ্ড। এক হাতে খালই ধরে হাঁটছে। এভাবেই প্রায় বাড়ির কাছের তেতুল গাছের নিচে আসতেই হটাত করে পিছন থেকে হ্যাঁচকা টানে হাত থেকে খালই ছুটে পরে গেল। জায়গাটা গ্রামের ভিতর বলে দুই পাশে বাশঝাড়, অন্যান্য বড় বড় গাছপালা ঝোপঝাড় বোঝাই তাই বেশ অন্ধকার। পিছনে ঘুরে দাড়াতেই মনে হল কে যেন গালে একটা চড় মারল। কে করল এই কাজ? আশেপাশে খুঁজে দেখার আগেই কে যেন সাড়াশির মত জাপটে ধরল, প্রচণ্ড চাপ সাথে কাচা মাছের বিকট গন্ধ। অনেকক্ষণ ধ্বস্তা ধ্বস্তি কিন্তু বাবা কিছুতেই সুবিধা করতে পারছিল না একে তো কাচা মাছের অসহ্য গন্ধ তারপর আবার প্রতিপক্ষের শরীর অসম্ভব রকমের পিচ্ছিল। কাঁধ থেকে জাল পরে গেছে আগেই, তুমুল জড়াজড়ি ধ্বস্তা ধস্তি হচ্ছে কিন্তু বাবাকে কাবু করতে পারছে না। অনেকক্ষণ চলছে এই কাণ্ড। হটাত কাছের বাড়ি থেকে কে যেন আলো নিয়ে বের হয়ে ঝোপ ঝাড়ের শেষ প্রান্তে সৈয়দ আলির বাড়ি যাবার জন্য এগিয়ে গাব তালয় এসে শুনতে পেল ঝোপের লতা পাতা নাড়াচাড়া হবার শব্দ হচ্ছে। ভাবল হয়ত কারো গরু ছুটেছে আর একটু এগিয়ে হারিকেনের আলোতে দেখে কে যেন কার সাথে কুস্তি লড়ছে। এই কি হয়েছে কি হয়েছে? থাম! থাম! আর একটু এগিয়ে দেখল শুধু লুঙ্গি পড়া খালি গায়ে বাদশা ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল। কাছে এসে দেখে অজ্ঞান হয়ে বাদশা পড়ে আছে।
এই কি হয়েছে তোর? কি হয়েছে? কোন সাড়া না পায়ে জোড়ে চেঁচিয়ে ডাকল এই বাদশার মা তাড়াতাড়ি আস দেখ তোমার ছেলের কি অবস্থা!
একটু দূরেই জালটা পরে রয়েছে তার পাশে একটা খালই।
দাদি সারা দিয়ে জিজ্ঞেস করল
ও ফজর ভাই কি হইছে!
তাড়াতাড়ি আইসা দেখ কি হইছে
একটা কুপি বাতি হাতে চিৎকার করতে করতে দাদি এসে দেখে আমার পিতাজি বাড়ির পাশের ঝোপের মধ্যে পরে রয়েছে আর তার পাশে ফজর আলি দাঁড়ানো,
কি হইছে ফজর ভাই? হটাত ছেলের দিকে চোখ পড়তেই, ওরে বাদশা কি হইল তর?
দাদি চিৎকার করে কান্না শুরু করল আর ফজর আলি ডেকে আরও দুই চারজনকে এনে বাবাকে ধরে বাড়ি নিয়ে এলো তখনই ধরতে গিয়ে দেখে সমস্ত শরীর পিচ্ছিল এবং মাছের আঁশটে গন্ধ।
ও ভাবি, পুলা কি ভুসকুরা গেছিল মাছ মারতে?
মাছ মারতে বাইর হইল জাল খালই নিয়া কিন্তু কোথায় গেছিল তা তো জিজ্ঞেস করি নাই!
বুঝছি ওই ভুসকুরাই গেছিল আর ওই পেত্নীর পাল্লায় পরছিল। দেখছ কেমন মাছের গন্ধ আর পিছলা!
বাড়িতে এনে চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে কিছুক্ষণ পরে জ্ঞেন ফিরে এলো। কিরে কোথায় গেছিলি?
চাচা ভুসকুরা গেছিলাম, মাছও পাইছিলাম কিন্তু একটা ঘটনা ঘটল যা এর আগে দেখি নাই
হ তোমার কওন লাগব না আমরা তাই কইতেছিলা্ম বাদশা ভুসকুরা গেছিল, আমি তোমার পাশে জাল দেখছিলাম আর ওই দিকে ভুসকুরা ছাড়া আর কই যাইবা তাও বুঝছিলাম
গরম পানি সাবান দিয়ে গোসল করিয়ে আগুনে ছেকে কাঁথা গায়ে মা শুইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল। পরদিন  ওই যেখানে বাবাকে পেয়েছিল ওখানে দেখে জালটা পড়ে আছে, পাশে খালই আর আশেপাশে কয়েকটা মাছের শুধু মাথা পড়ে আছে লেজের দিকে কিছুই নেই। খালইতে তখনও বেশ কয়েকটা কৈ মাছ। পাড়ার মুন্সি বাড়ি থেকে তাবিজ এনে বাবার গলায় দেয়া হয়েছিল।







No comments:

Post a Comment

Thank you very much for your comments.