Sunday, 9 December 2012

নক্ষত্রের গোধূলি-৬০ [অধ্যায় ৬]

[পূর্ব সূত্রঃ নক্ষত্রের গোধূলি-৫৯]
রাশেদ ভাই আপনি ভাল একটা বন্ধু পেয়েছেন আর ভাবিও কম না।
হ্যা কোন সন্দেহ নেই, আমরা সেই স্কুল জীবনের বন্ধু। তুমি তাহলে কাল সকালেই ওখানে চলে যেও।
হ্যা যাবো কিন্তু আমার একটু কাজ আছে।

আবার কি কাজ?
আমি বাড়িওয়ালাকে একশ পাউন্ড এডভান্স দিয়েছি সেটা চাইতে হবে।
ও, তাহলে কাল সকালে তাকে বলে তারপর ওখানে যাবে।
হ্যা তাই করতে হবে।
ওই লোক কি টাকা ফেরত দিবে, এ লোক কি বাঙ্গালি?
না, পাকিস্তানি।
আগে নোটিশ দিয়েছ?
হ্যা ওদের যাবার ডেট কনফারম করেই নোটিশ দিয়েছিলাম।

এ আবার আর এক ফ্যাকরা, একশ পাউন্ড কম না। বাংলাদেশের হিসাবে অনেক টাকা, দেখ কি করে, আমি শুনেছি পাকিস্তানিরা বদমাইশিতে সবার উপরে।
হ্যা আমিও তাই ভাবছি, দেখি চেয়ে দেখি যদি দেয় তো ভালো না দিলে কিছু করার নেই, আমি এখানে এই টাকা আদায়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারব না, না দিলে এটা ফেলেই যেতে হবে।
হ্যা তাই, এ ছাড়া আর কিই বা করার আছে! আচ্ছা শোন আমি কালই যাচ্ছি কিন্তু আমাদের যোগাযোগ হবে কিভাবে?
কেন আমার মোবাইল আছে এখানে এসেই নিয়েছিলাম।
তাই নাকি তো দাও নম্বরটা এখনি দাও আর আমি যেখানে যাচ্ছি এই নম্বরও রেখে দাও। দেখি আমি ওখানে যেয়ে দেখি কি অবস্থা, যদি সম্ভব হয় আমি চেস্টা করব তোমাকে আমার কাছে নিয়ে যেতে, হয়ত এক রেস্টুরেন্টে হবে না তবে এক এলাকায় হলেই হবে। কি জানি আমার ব্রিজেন্ড আর তোমার ডিডকোট কত দূর কে জানে, একটা ম্যাপ হলে দেখতে পারতাম। ওহ ভুল হল ফিরোজের বাসায় ম্যাপ ছিলো ওখানে দেখে নিতে পারতাম। আচ্ছা দেখব আমি আগে যাই ওখানে গিয়েই দেখব। বাসায় গিয়ে তোমাকে কিছু ভাত রেঁধে দিয়ে যেতে হবে। তরকারি যা আছে দেখেছি তাতে হয়ে যাবে। তোমার বৌতো আমার হিসাব করেনি তাই ভাত কম হবে। চল সরা সরি বাসায় চল আর কোথাও যাবার সময় নেই।
বাসায় এসে নাসির বলল রাশেদ ভাই আপনি এক কাজ করেন আপনি ভাত রান্না করতে থাকেন আমি দেখি বাড়িওয়ালাকে পাই কিনা যদি পাই তাহলে বলে আসি।
ঠিক আছে তাই কর।
ভাত রান্না হয়ে গেছে নাসির আসছেনা, প্রায় ঘন্টা খানিক পর এল।
কি ব্যাপার দেখা হল?
হ্যা হয়েছে কিন্তু সে যা বলছে তাতে টাকা পাওয়া সম্ভব হবেনা, সে বলছে এখন টাকা নেই আগামি সোমবারে দিবে।
তুমি কিছু বললেনা?
হ্যা তাইতো এতো দেরি হল। অনেক বুঝালাম, অনুরোধ করলাম বললাম আমি বৃহস্পতি বারে চলে যাব এই টাকা নেবার জন্য কিভাবে আসব, না তার একই কথা নট বিফোর মানডে, বলে তোমার একাউন্ট নম্বর দিয়ে যাও আমি জমা করে দিব। শালার না দেবার ফন্দি, জানে আমি টুরিস্ট আমি একাউন্ট নম্বর পাবো কোথায়।
তার মানে একশ পাউন্ড লস, বললাম না এরা এই ধরনের সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। কাকে কি ভাবে ঠকাবে।
যাকগে বাদ দেন ও টাকা আর পাব না, ওটা ফেলেই যেতে হবে।

খেয়ে দেয়ে অনেক রাত পর্যন্ত নাসিরের সাথে গল্প করলেন। দেশে কি করতেন, কেন, কি অবস্থার প্রেক্ষিতে এখানে এলেন সব কিছু প্রাণ খুলে বললেন। এখানে এসে কাজের অভিজ্ঞতা, লোক জনের আচরণ, কোথায় কোথায় কি ভাবে গেছে, কি কি কাজ করেছে, কি ভাবে দিন গেছে রাত গেছে, ঘুমের ওষুধ খেয়েও না ঘুমিয়ে কত রাত কেটেছে কত চোখের পানিতে বালিশ ভিজেছে যা কখনো মনিকে বলা হয়নি, মনিকে অনেক কথা বলেছে কিন্তু এই একটা কথাই বলতে পারেনি, সে কথা আজ নাসিরকে বলেছে, সব বলেছে। অনেক দিন পর কথা বলার মত মানুষ পেয়ে মনটা ভালো লাগছে। ফিরোজের সাথে কথা হয় কিন্তু সেতো সামান্য, বিশেষ করে কাজের কথা বলতে বলতেই সময় চলে যায় টেলিফোনে আর কত কথা বলা যায়? দুএক বার যাও দেখা হয়েছে সেও খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের দেখা এ সময়েও কাজের কথাই মুখ্য। এই কটা মাস যে কিভাবে গেছে। আশে পাশে মানুষ ছিল কিন্তু যারা ছিল তাদের সাথে কি আর মন খুলে কথা বলা যায়? সাগরে ভেসে থেকেও জল পিপাসার মত। মন খুলে কথা বলতে না পারা যে কি যন্ত্রনা, মনের মধ্যে কেমন যেন একটা চাপা ব্যাথা। না ব্যথা না, কি যেন কেমন যেন আলাদা একটা কষ্ট লুকিয়ে থাকে। সে কষ্ট বের করে দেয়া যায় না, সরিয়ে দেয়া যায় না। কেমন যেন ভারী বোঝা বয়ে বেড়ানোর মত, হাটতে গেলে পা চলে না, কাজে হাত চলে না মন বসে না, এলোমেলো আকাশ পাতাল ভাবনায় দিন যায়, রাতে চোখের পানিতে বালিশ ভিজে যায়। কেমন যেন বলতে না পারা একটা অন্য রকম অনুভুতি। মেয়েরা কে কি করছে, কে কেমন সব বলেছে। রিতা আপার ভাই শাহিনের সাথে কবে কি ভাবে পরিচয়, কখন কোথায় কি করেছে, কি ভাবে উভয়ের অজান্তে গভীর বন্ধুত্ব ঘনিষ্ট থেকে আরো ঘনিষ্ট হয়েছে সব কিছু খুলে বলতে পেরে সকালে রিতা আপার কারনে যে আঘাত পেয়েছেন তার কিছুটা যেন হালকা মনে হচ্ছে।

নাসিরও তার জীবনের অনেক কথা বলল। ওর বিয়ের অনেক আগেই শ্বশুর শ্বাশুড়ি বড় মেয়েকে তার নানির কাছে রেখে আমেরিকা চলে যেতে বাধ্য হয়, ভদ্র লোক এখানে ব্যাবসা করতেন ব্যবসায় প্রচুর ক্ষতি দিয়ে অনেক দেনায় জর্জরিত হয়ে যখন ঋণ শোধ করার আর কোন উপায় নেই তখন কিভাবে যেন একটা পথ বের করে আমেরিকা পাড়ি দিয়ে পালিয়ে রক্ষা পায়। সেই যে গেছে আর ফিরতে পারেনি এমনকি মেয়ের বিয়েতেও না। এ যাবত শ্বশুর শ্বাশুড়ি, শালা শালি কাউকে দেখেনি শুধু ফোনে কথা হয়েছে আর ছবিতে দেখেছে। তাদের ইচ্ছা ওরা দুই জনেই আমেরিকা চলে আসুক ওখানেই থাকবে, ছেলেটার চিকিৎসা হবে। রাশেদ সাহেব ছবি দেখে বুঝেছে এই ছেলে পোলিওতে আক্রান্ত। এটাতো ভালো হবার না। কিন্তু আশায় বুক বেধে যে বাবা ছেলের আরোগ্যের পথ চেয়ে বসে আছে তাকে কি ভাবে এ কথা বলে, তাই কিছু বলতে পারেনি। এই জন্যেই ওরা নানা জায়গায় ঘুড়ে ঘুড়ে পাসপোর্ট ভারী করছে। মানুষ আশা তরী বেয়ে কত কি করতে পারে, কোথায় কোথায় চলে যায় কত কি করে। সেই স্বপ্ন তরী গুলো মানুষকে কত কি করতে আগ্রহ যোগায়, শক্তি যোগায়। এই স্বপ্ন তরী গুলিই নাসিরকে দিয়ে সারা পৃথিবী ঘুড়ে ঘুড়ে আমেরিকা যাবার বীজ বু্নিয়ে চলছে। ঢাকায় বাবার স্টীল ফার্নিচারের ব্যাবসা ছিল বাবা মারা যাবার পর ছেলেরা কেউ আর সে ব্যাবসা ধরে রাখতে পারেনি, চায়ওনি। ওরা ওদের মত করে নিজেরা আলাদা ব্যাবসা করছে। বাবার রেখে যাওয়া ব্যাবসা ভালো লাগেনি, ভালোই চলছে, ভালোই আছে।

নাসির, তিনটা বেজে গেছে এবার ঘুমাতে হয়। আমার গত রাতে একটুও চোখ বন্ধ হয়নি তবুও ঘুমাতে ইচ্ছা হচ্ছে না মনে হচ্ছে আরো কথা বলি, কত দিন কথা বলি না। মনি যাবার পর এই প্রথম এত কথা বললাম।
ভাবির নাম বুঝি মনি?
রাশেদ সাহেব একটু হেসে জবাব দিলেন, না সে শুধু আমার মনি, আর কারো কাছে মনিরা কারো কাছে মিসেস হাসান।
ছবি নেই কোন?
না সাথে নেই, মেইলে আছে, তোমার মেইল এড্রেস দিও আমি এটাচ করে দিব দেখে নিও। নাসির কাল যদি ওখানে যেতে না হত তাহলে আরো গল্প করতাম, এখন মনে হচ্ছে কাল যাব কথাটা বলা ভুল হয়ে গেছে। আমি কি জানি যে তোমার বাসা আছে, আগে জানলে কাল এখানে থেকে পরশু দুজনে এক সাথে বের হতাম।
হ্যা রাশেদ ভাই আমিই কি জানতাম যে আপনি এই ভাবে আছেন তা হলে তো কাল আমরা সারা দিন বেড়াতে পারতাম।
যাক যা হবার হয়ে গেছে এখন শুয়ে পর দেখি ঘুম আসে কিনা। সকালে কখন উঠবে?
এক সময় উঠলেই হল, আপনার কোচ তো বারটায় তাই না?
হ্যা।

তাহলে এখান থেকে এগারোটায় বের হলেই হবে। নয়টা বা দশটায় এক সময় উঠলেই হবে বিশেষ কোন তাড়া নেই।

[আসুন, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া এই দেশ, আমাদের এই প্রিয় ঢাকা শহরের জন্য কিছু রেখে যাই। আমাদের প্রজন্মের কাছে যেন আমাদের হেয় হতে না হয় কিংবা জবাবদিহি করতে না হয়!]

No comments:

Post a Comment

Thank you very much for your comments.