Thursday, 29 November 2012

নক্ষত্রের গোধূলি-২৩ [২য় অধ্যায়]

[পূর্ব সূত্রঃ নক্ষত্রের গোধূলি-২২, ঘরে গিয়ে শীতের কাপড় চোপর ছেড়ে কোন ভাবে রান্না ঘরে এসে খেয়ে মনিকে নিয়ে উপরে গিয়েই এই পৃথিবীতে এক মাত্র আশ্রয় মনির বুকে মাথা রেখে শুধু জিজ্ঞেস করলো,
মনি, একি হল? কেন এমন হল? এটা কিসের প্রাপ্তি?]
মনিরা কিছু বলতে পারল না শুধু স্বামীর মাথাটা শক্ত হাতে চেপে রেখে চুপ করে রইল। মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে রাশেদের ঘুমের জন্য চেষ্টা করতে লাগল। রাশেদের ঘুম আসছে না। মনে মনে বার বার ওই এক কথাই ভাবছে। কি হল, কেন হল? কোন জবাব সে খুজে পেল না। আজ যদি ফিরোজ গাড়িতে করে না নিয়ে যেত, তারা যদি কোচ বা ট্রেনে করে যেত তাহলে কি হত? কি করতে পারত সে! এই শীতের মধ্যে এতগুলি মালামাল সহ একজন মহিলাকে নিয়ে তার কি অবস্থা দাড়াত? সে মনিরাকেও আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পাচ্ছে না। মনিরাও একই কথা ভাবছে। দু’জনের কারোরই ঘুম আসছে না। সারাটা রাত নিদ্রাহীন ভাবেই কেটে গেল, কিন্তু এর মধ্যেও কেও কাউকে কিছু জিজ্ঞ্যেস করতে পারছে না। কারো মুখে কোন কথা নেই, নীরব, নিস্তব্ধ। যেন কোন রাক্ষস পুরী থেকে তারা কোন ভাবে প্রান নিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছে, সেই রাক্ষস পুরীর আতঙ্ক ওদের কন্ঠ রুদ্ধ করে দিয়েছে।
সুখের রজনী কোথা দিয়ে পার হয়ে যায় সে কেও কোন দিন টের পায় না, হিসেব কেও রাখতে পারেও না, কিন্তু দুঃখের রজনী?সে্তো সহজে পোহাতে চায় না, সহজে শেষ হয় না, যেন অনন্তের যাত্রা। সে যাত্রা যে কোথায় শেষ হবে তা কেও জানে না। কাটা জর্জরিত সে পথ ফুরাতে চায় না। এই এত বড় পৃথিবীর কে কোথায় সুখে আছে আর কে দুঃখে আছে সে হিসেব কে রাখে?এতো পৃথিবীর কাজ না। তোমরা কে সুখে আছ আর কে দু;খে আছ সে দেখতে গেলে কি আমার চলে?আমিতো তোমাদের সবাইকেই জায়গা দিয়েছি। তোমরা নিজ নিজ সুখ বা দু;খ খুজে নাও, আমাকে আমার পথে চলতে দাও। তোমাদের জন্য কি আমি থেমে থাকতে পারি?আমাকে কেও কখনো দেখেছ ক্ষন কালের জন্য আমি থেমেছি?

রাতের পরেই দিন আসে, উদয় হয় নতুন সুর্যের। বিগত রাতের সকল দু;খ ব্যাথা, আনন্দ বেদনা সব কিছু সুর্যের তাপে জ্বলে পুরে নিঃশেষ হয়ে য়াবার নতুন করে সব শুরু হয়। মানুষ নতুন প্রেরনা পেয়ে, নতুন উতসাহ নিয়ে, শক্তি নিয়ে আবার শুরু করে। এই বুঝি প্রকৃতির উপহার। এই বুঝি তার সব দুঃখ, জ্বালা যন্ত্রনা সব শেষ হয়ে যাবে। এক সময় রাশেদ মনিরার কাল রাত্রি শেষ হয়। এটা লন্ডন শহর, এখানে আজানের সুরে ভোড় হয় না। এখানে ভোড় হয় ঘড়ির কাটা ধরে। সুর্য উঠুক বা না উঠুক, ঘড়ির কাটা ধরে ভোড় হয়ে যায়। আজ আকাশটা একটু ফর্সা দেখাচ্ছে, পাশের ট্রেন লাইন ধরে ভোড়ের প্রথম ট্রেন যাবার শব্দ ওরা দু’জনেই শুয়ে শুয়ে শুনল।

এতক্ষনে মনিরা রাশেদকে বলল, উঠবে?
রাশেদ বলল ওরাত কেও উঠেনি, একটু পরেই উঠি।
সারা রাত তুমি ঘুমাওনি।
তুমিও ঘুমাওনি।
শোন মনি, কাল যা হলো, যা দেখলাম তার শিক্ষাটা রেখে বাকী সব ভুলে যাবার চেষ্টা কর, আর কাওকে কিছু বলার দকার নেই। এই লজ্জার কথা, এই অপমানের কথা কি বলা যায়?তাছাড়া জানিয়ে হবেই বা কি?

হ্যা, আমিও তাই ভেবেছি, যদিও আমি সারারাত ভেবে এর কোন কুল কিনারা পাইনি, নিজের সাথে যুদ্ধ করেও কোন সমাধান পাইনি, তোমাকে আর কি সান্ত্বনা দিব?আমি সে ভাষা খুজে পাইনি। তাই আমিও তোমাকে বলব বলে ভেবে রেখেছি এ ভুলে যাওয়াই ভালো। আশা করি এর একদিন পরিবর্তন হবে। যদি নাও হয় তবে ভাববো এটাই আমাদের নিয়তি।

হ্যা মনি আমিও আশা করি একদিন এই লোহার কপাট ভাংবে তবে হয়তবা সেদিন সব শেষ হয়ে যাবে। তুমি লক্ষ করনি ওখানে যখন ওরা দরজা খুলছিলোনা বলে আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম তখন ফিরোজ আমার কানে কানে বলছিলো তোমার ভাই নিশ্চয়ই ঢাকায় ফোন করে তোমার বাবার সাথে কথা বলে নিচ্ছিলো, সে এখন কি করবে এই ব্যাপারে। এছাড়া আমি দরজা না খোলার আর কোন কারন খুজে পাচ্ছি না। এখন আমার মনে হচ্ছে ফিরোজের অনুমান একেবারে নির্ভুল। কি জানি হতেও পারে, আমারও মনে হয় কথাটা ভুল না। তাই বলে এ কি করে সম্ভব?

চল আজ কোথাও থেকে বেড়িয়ে আসি।
কি যে বল তুমি, আমার আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না।
তুমিই বা কি বলছ, কেন যেতে ইচ্ছে করবে না?কাওকে তো আর সাথে যেতে বলবো না। এমনকি ফিরোজকেও না। একটা ব্যাপার লক্ষ করেছ?
কি?
দেখ ফিরোজ কিন্তু আমরা আসার পর আমাদের সংগ দেবার জন্য কাজে যাচ্ছে না, এটা কিন্তু এদেশে আশা করা যায় না। চল শুধু তুমি আর আমি কোথাও থেকে একটু ঘুড়ে আসি। সারা দিন বাইরে ঘুরব, ঘরে বসে থাকলে আরো খারাপ লাগবে। তার চেয়ে চল পিকাডেলি সার্কাস, টেমস নদী, বিগ বেন, বাকিংহাম প্যালেস এসব দেখে আসি হয়তবা কাটা ঘায়ে একটু মলমের প্রলেপ হয়েও যেতে পারে। তুমি আমার সাথে আমার পাশে থাকবে, এই এতো বড় লন্ডন শহরে শুধু তুমি আর আমি। কেও জানবে না যে আমরা মনের আঘাতের চিকিৎসার জন্য ঘুড়ে বেড়াচ্ছি। আঘাতটা যত তারাতারি সম্ভব সারিয়ে তুলতে হবেতো। তুমি চলে গেলে আমি এই আঘাত বুকে নিয়ে থাকবো কি করে?
তুমি যদি মনে কর এতে কালকের ঘা শুকিয়ে যাবে তাহলে বেশ, চল। কিন্তু, তুমি কি চিনে যেতে পারবে?

এখনো তোমার সন্দেহ যায় নি?চলনা গেলেই দেখবে, নাহয় একটু বেশি হাটলেইবা। এদেশেতো রিকশা নেই যে ‘এই রিকশা চল’ বলে আমার মনিকে রিকশায় নিয়ে যেতে পারব।
হাত মুখ ধুয়ে শীতের কাপড় পরে দুই জনে এক সাথে নিচে নেমে এলে
ভাবী জিজ্ঞ্যেস করল কি ব্যাপার কোথাও যাবেন বুঝি?
হ্যা ভাবী যাই দেখি একটু ঘোরাঘুরি করে আসি।
যান ভালো লাগবে। ঘুড়ে আসুন, ইফতারের আগেই এসে পরবেন।

ইস্ট একটন টিউব স্টেশ্নে এসে অল(ছয়টা জোন)জোনের দুইটা টিকেট নিয়ে ট্রেনে চেপে ম্যাপ দেখে দেখে এখান থেকে সেখানে, সেখান থেকে ওখানে, ওখান থেকে নানান জায়গায় সারাটা দিন ভরে ঘুরে ঘুরে অনেক কিছু এক নজর দেখে গেল। প্রথমে লন্ডনের বাঙ্গালি প্রধান এলাকা হোয়াইট চ্যাপেল এসে এটা সেটা কিছু দেখে গেল। বাকিঙ্গহাম প্যালেস, ট্রাফেলগার স্কোয়ার, ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারী, সবই টিউব থেকে নেমে স্টেশনের উপরে এসে এক নজর চোখের দেখা দেখে আবার টিউবে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের বাইরে থেকেই চলে এসেছে ভিতরে যাবার সময় বা মন মানসিকতা নেই। পাশের একটা ফোন বুথ থেকে বাড়িতে মেয়েদের সাথে কথা বলল। তারপর সবার শেষে টেমস নদীর পাড়ে এক জায়গায় ফুট পাথের পাশে রেলিং ধরে দু’জনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলো টেমসের বয়ে যাওয়া স্রোতের দিকে। মনি দেখ, এইতো টেমস নদী, টাওয়ার ব্রীজ, এতকাল যা ছবিতে দেখেছ আজ তা নিজ চোখে দেখে নাও।

সুদূর বাংলদেশ থেকে দুই জন ভাগ্য বিতাড়িত নর নারী টেমসের পাড়ে দাড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে সে কি বুঝতে পারছে কিছু, এরা যে ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য এখানে এসেছে। ওদের দেশের মাটিতে ভাগ্যের জমি এতই অনুর্বর যে শেষ পর্যন্ত তাদের ওখানে ঠাই হলো না। অন্তহীন জ্বালা বুকে চেপে এইযে ঘুড়ে বেড়ানো এর শেষ কোথায়, এর পরিণতী কি, এ ভাবে কতদূর যেতে হবে কোথায় যেতে হবে তাও ওরা জানে না। মনি শুনছ?
বল।

আজ এখানেই কিছু খেয়ে ইফতার করি?চল আবার হোয়াইট চ্যাপেলে যাই ওখানে কত বাঙ্গালি রেস্টুরেন্ট দেখে এলাম।
না পাগল, চল বাসায় চল, ভাবী বলে দিল না যে ইফতারির আগে চলে আসতে। চল তা হলে।
বিকেলে সাড়ে তিনটার দিকে ইফতারির কিছু আগে এসে দেখে ভাবী বিশাল আয়োজন করেছে।
তাই দেখে মনি বলল দেখেছ না এলে কি হতো?

ফিরোজ পিছনের বাগানে কি যেন করছিল ওদের সারা পেয়ে ভিতরে এসে বলল এইযে স্যার এতো দেরি করলেন, কোথায় গিয়েছিলেন?
আরে এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন ইফতার করে নিই সব বলবো। ম্যাডামকে লন্ডন দেখিয়ে নিয়ে এলাম।
শেফালি বলল তাহলে আর আমি কি দেখাব?
না আপনার কিছু জন্য কিছুতো বাকী রেখেছি, আমি কি এতই বোকা?
ইফতার খেয়ে নামাজ কালাম পড়ে ফিরোজ বলল চল একটু ঘুরে আসি, আমি তোমাদের জন্য সেই কখন থেকে বসে আছি।
কি মনি আবার যাবে?
চল।
এবারও ভাবীই গাড়ি চালাচ্ছে আর ফিরোজ পাশে বসে বিবরনি দিয়ে যাচ্ছে। ওই দেখ এটা হচ্ছে হোয়াইট সিটি এখানে বিবিসি ব্রডকাস্টিং অফিস, এই জায়গার নাম মার্বেল আর্চ, এটা অক্সফোর্ড সার্কাস এখানে বড় লোকদের শপিং সেন্টার। এই ভাবে নানা জায়গা ঘুরে ঘুরে শেষ পর্যন্ত সেই টেমসের পাড়। ওই যেখানে ওরা বিকেলে এসেছিল।

রাশেদ বলল ঠিক এই খানেই আমরা বিকেলে এসেছিলাম।
তাই নাকি?
চল এখন তাহলে রাতের টেমস দেখবে।
গাড়ি থেকে সবাই সেই রেলিং ধরে দাড়ালো।
ফিরোজ বলল কি ভাবি দিনের টেমস আর রাতের টেমসের মধ্যে কোন তফাত খুজে পাচ্ছেন?

হ্যা, শুধু টেমসই না পুরো লন্ডনের চেহারাই রাতে ভিন্ন রকম লাগছে। এ কি আর বলে দিতে হবে ভাই?এ যে লন্ডন মহানগরী। আমার পরম ভাগ্য যে আপনার বন্ধু আমাকে ছেড়ে কিছুতেই এলো না। আবার আমি এসে আপনাদের মত এত আপন জনের সাক্ষাত পেয়েছি যে তা কোন দিন ভুলতে পারবো না। ও যদি জোড় করে নিয়ে না আসত তাহলেতো আমার আসাই হত না, এতো কিছু দেখতেও পারতাম না।

[আবার দেখা হবে। শীতের শেষে যেদিন বইবে বসন্ত সমীরণের মাতাল খেলা, যেদিন রাশেদ মনিরার জীবনে আসবে সামান্য স্বস্তির আশ্বাস তেমনি কোন আলো ঝলমল দিনে। এতদিন রাশেদ মনির সাথেই থাকুন।]

No comments:

Post a Comment

Thank you very much for your comments.