Friday, 30 November 2012

নক্ষত্রের গোধূলি-৩০ [তৃতীয় অধ্যায়]


[পূর্ব সূত্রঃ
মারুফ, কাস্টমার শেষ। আজকে আর ব্যাবসা হবেনা আটাইয়া লউ বারি যাই।
এবার মারুফ কবির কে ডেকে বলল-
নয়া ভাইছাবকে হেল্প কর।
আচ্ছা ঠিক আছে, আসেন ভাইছাব।]

শুরু হল আর এক অধ্যায়।

প্রায় তিন থেকে চারশত প্লেট বাটি পেয়ালা বিশ পঁচিশটা বিভিন্ন সাইজের ডেকচি ট্রে ইত্যাদি মিলিয়ে আরো চল্লিশ পঞ্চাশটি। এগুলি যখন জমা হচ্ছিল তখনি ভাবছিল এতো গুলি ধোয়া হবে কিভাবে? এ তো রাত পেরিয়ে যাবে। ভীষন চিন্তা হচ্ছিল। কবির ওই খালি সিংকটা গরম পানি দিয়ে ভরতে বলল। আঁটান শব্দটি আগে কখন শোনেনি তবে কথার পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ি অনুমান করে নিল মানে কি হতে পারে। সিঙ্কের মধ্যে তো আর সব বাসন পেয়ালা জায়গা হয়নি, বেশীর ভাগই নিচে নামিয়ে রেখেছিল। সিঙ্ক যেটা খালি ছিল সেটা সহ দুইটাতেই পানি ভরা হলে পাশে রাখা লিকুইড সাবান ঢেলে দিল। যেটা ভরা ছিল সেটায় একটু বেশি। এবারে বড় একটা স্পঞ্জের টুকরো দিয়ে এঁটো বাসন বাটি গুলি ভরতি সিঙ্কের মধ্যে একটা ডলা দিয়েই সাথে সাথে পরিষ্কার সিঙ্কের মধ্যে ছেড়ে দিল আর রাশেদ সেগুলি উঠিয়ে উপরে পাশে পাশে খাঁচার মধ্যে সাজিয়ে রেখে যেতে লাগল। এতেই রাশেদ সাহেবের ঘর্মাক্ত অবস্থা। ওই সিঙ্ক শেষ হলে রাশেদ সাহেব নিচে থেকে উঠিয়ে আবার ওই নোংরা সিঙ্কের মধ্যে ছেড়ে দিল। আবার সেই একই প্রক্রিয়া। মোটামুটি যা ভেবেছিল রাশেদ তার চেয়ে অনেক কম সময়ের মধ্যেই সিঙ্ক খালি। অবশ্য রাশেদ একা করলে হয়ত সারা রাতেও পারত কিনা সন্দেহ। এই দেখে দেলোয়ার বলল-
দেখলেন ফাস্ট কাকে বলে এইরকম করতে হবে।

ওদিকে ওই যে উপরে যেগুলি খাচায় রেখেছিল সেগুলির পানি ঝরে শুকিয়ে গেছে। ওগুলি আবার ওখান থেকে নামিয়ে কবিরের দেখিয়ে দেয়া ভিন্য একটা হট বক্সের ভিতরে রিখে দিল। ওদিকে দেলোয়ার আর মারুফ তাদের চুলা যেটায় এক সাথে ছয় টা বার্ণার ব্যাবহার হয় ওটা আর তন্দুর ধোয়া মুছা করছে। জিনিস পত্র গুছিয়ে রাখছে। এমন সময় মালিক আনোয়ার এসে বলল-
কি নয়া ভাই সাহেব ঠিক আছেন তো? আরো ফাস্ট করেন।
সবাই রাশেদ সাহেবকে নিয়ে মোটামুটি হাসি তামাশা হৈ চৈ গালা গালি যার যখন যা ইচ্ছা চালিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু রাশেদ সাহেব কোন প্রতিবাদ করছে না। আরে এইটা করতে এতক্ষণ লাগে নাকি, ওইটা কোথায় থাকে জানেন না, একটু দেখে নিলেই তো হয়, হা করে কি দেখেন এই ধরনের সব কথার প্রতিবাদ করবেই বা কি। নিরবে শুনে যাওয়াই ভালো। বোবার নাকি শত্রু থাকে না। ঘড়ি দেখার কথা মনে নেই। মারুফ বলে-
ওরে বাবা সারে বারোটা বেজে গেছে? তারাতারি কর সবাই। নয়া ভাইসাহেব আপনি মপের বালতি ভরে চুলায় দেন। মপের পানি গরম হলে বলল-
ওই যে ওই খানে ব্রাশ আছে ওটা নিয়ে আসেন। পারবেন তো ব্রাশ করতে? দেন আমি দেখিয়ে দেই বলে বালতিতে গুরা সাবান, ব্লি্‌চ, এন্টি ব্যাক্টেরিয়াল সুগন্ধি মিশিয়ে বলল-
দেখেন কি ভাবে ব্রাশ করবেন।

দেখিয়ে দেয়ার পর রাশেদ পুরো কিচেন আর তার পাশের স্টোরে মপ মেরে জিজ্ঞেস করল-
এই পানি কোথায় ফেলব?
দেলওয়ার বাইরে নিয়ে গিয়ে একটা ড্রেনের মুখ দেখিয়ে বলল-
এই খানে ফেলবেন সবসময়। আর ওই বালতি ব্রাশ এই যে এইখানে রাখবেন সবসময়। একই ভাবে করবেন যাতে করে আপনে যেদিন না থাকবেন সেদিন যেন আমাদের কারো খুজে পেতে অসুবিধা না হয়।
ফিরে এসে দেখে কাজ কর্ম সব শেষ। কিচেন দেখে মনেই হবে না এখানে এতক্ষণ মহাজজ্ঞ চলেছে। সমস্ত কিচেন চক চক করছে।
এই যে ভাই সাহেব হাত মুখ ধুয়ে আসেন।
কেন?
খাবেন না?
ও আচ্ছা, তা হলে আমি কাপর গুলিও বদলে আসি। সিঙ্ক থেকে নোংরা পানি ছিটে এসেছে কেমন লাগছে এই কাপর গায়ে খেতে পারবেনা।
বলেই রাশেদ আর দেরি করলো না। সারা দিনের এই নতুন ধরনের শারীরিক পরিশ্রম যাতে সে অভ্যস্ত নয়। এর পর বিষণ্ন মন, অবসাদ আর ক্লান্তিতে সমস্ত শরীর যেন আর চলতে চাইছিল না। কোন রকম টেনেটুনে তিন তলায় এসে কাপর বদলে বিছানায় একটু বসে মনে হল কতদিন যেন বসতে পারেনি। মুখে হাত দিয়ে দেখে লবন কিচ কিচ করছে। সেই সাড়ে পাচ টার পর একটা সিগারেট ও টানার সুযোগ পায়নি। আগে একটা সিগারেট বানিয়ে তারাতারি দুটো টান দিয়ে অ্যাশট্রে ফেলে দিলো। বেশি দেরি হলে আবার কি বলে এমনিতেই নতুনের দোষ বেশি।
বাথরুমে গিয়ে সাবানের কথা মনে হল কিন্তু সাবানের কথা আগে একেবারে মনেই হয়নি এখন আর অত দূরে সাবান আনতে যেতে ইচ্ছা হল না। সাবান ছাড়াই মুখ হাত ভাল করে গরম পানি দিয়ে ধুয়ে নিচে এসে দেখে সবাই যার যার মত কিচেনে দাড়িয়ে দাঁড়িয়েই খাচ্ছে। মালিকদের অন্য এক অংশীদার ওসমান বলল-
নেন নেন ভাই তারাতারি একটা প্লেট নেন।

রাশেদ সাহেব দেখল সে যেখানে প্লেট গুলি ধুয়ে রেখেছে এগুলি সেই প্লেট। সে নিজেও একটা হাতে নিয়ে নিল। আসাদ ভাতের ডেকচি আর তরকারির হাড়ি দেখিয়ে দিল। মারুফ বলল-
নিজেই নিয়ে নেন কেউ দিয়ে দিবে না।
ও আচ্ছা, ঠিক আছে নিচ্ছি বলে দেখল কাস্টমারের জন্যে যে প্লেইন রাইস সেই একই রাইস, তরকারির হাড়িতে দেখে কিসের মাংশ যেন।
এটা কি গরুর মাংশ?
না না এ হল ল্যাম্ব মানে ভেড়া। কেন খান না নাকি?
না না সেরকম কিছু না সবই খাই।
ঠিক আছে, নিয়ে নিবেন যা লাগে।
ওসমান বলল-
ভাই সাবের সাথে তো কথা বলার সময় পাইলাম না, ঠিক আছে আছেন তো পরে আলাপ করবো।
এর মধ্যে তার খাওয়া শেষ। কোন রকম হাত টা ধুয়ে বলল আচ্ছা আমি আসি, সালামালেকুম বলেই দৌড়।
রাশেদ খেতে শুরু করেছে। আসাদ বলে-
কি ঠিক আছে চলবে তো না কি?
হা ভাই চলবে মানে কি চালাতে হবে এছাড়া তো উপায় নেই।
আচ্ছা আপনি এই কাজ নিলেন কেন? আপনার তো এই কাজের বয়স না। দেশ থেকে কবে এসেছেন, দেশের খবর কেমন, ওখানে কি করতেন ইত্যাদিসহ নানা প্রশ্ন যা এখন রাশেদের কাছে যন্ত্রণার মতো মনে হচ্ছিল। এমনিতেই কথা বলতে ভাল লাগছিল না তার মধ্যে একই প্যাচাল বার বার আর কত! কেন মানুষের এতো কৌতুহল কেন? আমি কি করতাম তা জানার কি এমন দরকার? কি হবে জেনে? যাই হোক কিছু বুঝতে দিলো না। অবলীলায় তার সব কথার জবাব দিয়ে গেল।

যদিও সে বুঝতে পারছিল এটা হল আলাপ করার একটা পদ্ধতি। প্রথম আলাপ আর কি ভাবে শুরু করে তাই এই সব অবান্তর প্রসঙ্গ। তবে যাই হোক লোকটাকে ভালোই লাগলো। নতুন এসেছে এতো বিরক্ত হলে তো চলবে না কিন্তু তার মনের অবস্থা তো তার জানার কথা নয় তাই এই প্রসঙ্গ। কি আর করা যাবে এই ভাবেই তাল মিলিয়ে চলতে হবে তো। সবার কাছ থেকেই ভাল আশা করা সম্ভব নয়।
যাক ভাগ্যে যা আছে, ভাগ্য যেদিকে নিয়ে যেতে চায় চলুক সেই দিকে। রান্না খারাপ ভালো দেখার অবস্থা নেই। কোন ফাকে যে রান্না করেছে কে করেছে তা রাশেদ সাহেব খেয়াল করতে পারেনি। আর করবেই কখন এক সাথে দুই তিন জনে হুকুম করেছে। কোথায় কি থাকে, কি আছে, কাকে কি বলে এগুলি তো কিছুই জানা নেই। তারপর কিভাবে কি করবে তাও কিছু জানা নেই। কেউ যে দেখিয়ে দিবে সে উপায়ও নেই। সবাই যার যার মত ব্যাস্ত। আর এক সমস্যা হলো ভাষা। কথাটা শুনেছে কিন্তু বুঝতে পারছেনা, জিজ্ঞেস করেছিল দুএক বার। জবাব শুনে আর করতে ইচ্ছা হয়নি। যেমন বাংলা টাও শিখে আসেন নাই!! একবার বলেছিল এটা তো বাংলার একটা আঞ্চলিক রুপ সে তো আমার সব বোঝার কথা নয়।
কি বললেন আমরা বাঙ্গালি না?
না না তা হবে কেন?
ও! উনি শুদ্ধ ভাষা ছাড়া বুঝেন না তা জানেন না? এখানে সবাই এই রকম কথা বলে তো আপনে এখানে আসলেন কেন?
এই হল অবস্থা। এর পর আর কিছু বলার প্রবৃত্তি হয়নি। দেখা যাক ধীরে ধীরে যদি কিছু বোঝা যায়, যাবেই এক সময়। কাজের যে চাপ, যে অবস্থা তাতে বাংলাদেশ হলে অন্তত আরো চার জন লোক প্রয়োজন হতো। তাছাড়া আজ একেবারে ভিড়ের মধ্যে এসে পরেছে। কেউ কিছু দেখিয়ে দিতেও পারছেনা আর তার নিজেরও হঠাত পরিস্রম হয়ে যাওয়ায় কুলিয়ে উঠতে পারেনি। কয়েক দিন গেলে সব কিছু দেখা চেনা রপ্ত হয়ে গেলে মনে হয় ঠিক হয়ে যেতে পারে। দেখা যাক কি হয় কবির তো বলেছে সব কিছু চেনা জানা হলে কষ্ট কম হবে। দেখা যাক। আর কিই বা আছে দেখার, যেভাবেই হোক এর মধ্যেই সব গুছিয়ে নিতে হবে। আর তো কোন বিকল্প নেই। রাশেদ সাহেবের ধৈর্য্য এবং সহ্য একেবারে খারাপ নয়।

কি খাচ্ছে কেমন হয়েছে সেদিকে মন দেবার মত সময় এটা নয়। পেট ভরছে কিনা এইই যথেষ্ঠ। আর সবাই চলে গেছে শুধু আসাদ খাওয়া শেষ করে ওর সাথে বসে আছে। বলল-
ভাত তরকারি নেন, সারা দিন তো খুব ধকল গেছে ভাল করে খান কালকে কিন্তু আরো বিজি হবে।
হ্যা আর একটু ভাত লাগবে এইতো নিচ্ছি।
বিশাল ডেকচির মধ্যে একটা পিরিচ রাখা যেটা দিয়ে প্রথম ভাত নিয়েছিল ওটা দিয়েই আবার আরো একটু ভাত নিয়ে একটু ভেড়ার মাংশের তরকারি নিয়ে খেতে খেতে কথা বলছিল।
আমি তো মনে করেছিলাম এসব খাবার হয়তো এখানে পাওয়া যাবেনা হয়তো ব্রেড বাটার খেয়ে কাটাতে হবে।
না তা কেন, এই তো রাতে এক দিন ভেড়া এক দিন মুরগি আর দুপুরে প্রতিদিনই মাছ।
সকালে?
না সকালের জন্য এমনি কিছু নেই তবে দেখে নিবেন যা আছে এর মধ্যে আপনার যা ভাল লাগে তাই খেয়ে নিবেন।
না মানে আপনি বা সবাই কি খায়?
কেউ ব্রেড খায় কেউ কর্ণ ফ্ল্যাস্ক আর দুধ যার যা ইচ্ছা।
ও আচ্ছা। এখন তো রোজা কাজেই সকালের চিন্তা কয় দিন নাই তাই না?
না রোজা আর কয় দিন এই তো আর মাত্র তিন বা চার টা আছে হয়তো।
ঈদে কি এখানেই থাকবেন?
হা, তাছাড়া আর কোথায় যাব?
ও ভালো কথা, সেহরির কি অবস্থা?
আমরা সাধারনত, এই যে এখন সবাই উপরে উঠে গেছে যেয়ে দেখেন সবাই তাস খেলছে। রাত দুই টা বা আড়াইটার দিকে সবাই এসে সেহেরি খাবে। দেখি সেহরির জন্য আজ কি রান্না করেছে বলেই নিচু হয়ে রাশেদ যে টেবিলের উপর বসে খাচ্ছিল ওটার নীচে ডেকচি আছে তাই খুজে পেয়ে বলল ওঃ মাছ আর আলু।
কি মাছ?
মনে হয় রুই। কি শেষ? ও হা প্লেট টা ওই যে ওই সেলফের মত ওই ব্রাকেটের মধ্যে রেখে দিন। বেশ চলেন এবার। আপনার বেড কোনটা দিয়েছে?
ওই তো তিন তলায়, আর আপনার?
আমার এই যে গোয়াল ঘরে ওই দরজার বাম পাশে যেটা ওটা।

কথা বলতে বলতে সদ্য শোনা গোয়াল ঘরে ঢুকল। আগে আসাদ পিছনে রাশেদ।
এই যে নয়া ভাইসাব আসেন আসেন তাস খেলতে খেলতে মারুফ বলে উঠল আপনার সাথে তো আজ কথাই বলা হয়নি আসলে আপনেও এমন বিজির মধ্যে আসলেন। তা বলেন কেমন লাগলো? এইতো কালকের দিন গেলেই দেখবেন সব ঠান্ডা। শুধু শুক্র আর শনি বারেই যা একটু ঝামেলা তারপর এরকম থাকে না। ঠিক হয়ে যাবে।
কবির বলল-
না আপনে যান গোসল করলে করে নেন এখন একটা বাজে দুইটায় আমরা পতা খাই আপনে ওই সময় চলে আসবেন আর যদি বসতে চান বসেন।
না আমি না হয় যাই টায়ার্ড লাগছে পরে অবসর মত আলাপ করা যাবে। আচ্ছা ওই যে বললেন পতা, এর মানে কি?
রাশেদ সাহেবের কথা শুনে সবাই হেসে উঠল।
আরে পতা মানে জানেন না?সেহরী, সেহরী, বুঝলেন?
হ্যা এখন বুঝলাম। আচ্ছা কাল কখন ডিউটি?
কাল সকালে সাড়ে এগারটায় নামবেন।
তাহলে ভাই আমি আসি কিছু মনে করবেন না ভীষন টায়ার্ড লাগছে।

না না মনে করার কিছু নাই আজকে যান তবে সবসময় একা থাকবেন না তাহলে খারাপ লাগবে।
রাশেদ সাহেব উপরে এসে নিজের বিছানায় বসলেন সারা দিনে নামাজ পরা হয়নি। তারাতারি বাথরুমে গিয়ে ওজু করে রুমে আসতে আসতে পানি শুকিয়ে গেছে আর তোয়ালে বের করার দরকার হলো না। কিন্তু জায়নামাজটা মনে হয় বের করতে হবে। একটু এদিক ওদিক তাকাতেই চেয়ারের উপর দেখলেন জায়নামাজ। দেখে বুঝলেন নুরুল ইসলামের হয়তো হবে এটা। এখন কেবলা? না এবার তো নিচে যেতেই হবে। নিচে গিয়ে দেখে সবাই তাস নিয়ে বেশ ভাল জমিয়ে নিয়েছে। আচ্ছা ভাই কেবলা কোন দিকে?
নুরুল ইসলাম ওই ঘরেই দেখিয়ে দিল এই যে এই দিকে।
উপরে এসে নামাজ পরে নিলেন। এতো রাত হয়েছে তবুও বাইরে নারী পুরুষের হই চই হাসা হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে। জানালার ডবল কাচ ভেদ করে সে শব্দ আসছে। দেখার মত কৌতুহল নেই। বেশি ক্ষণ বসলেন না। উঠে সুটকেস টা খুলে লুঙ্গি আর শোবার কাপর চোপর টুকি টাকি বের করে টেবিলের উপর রাখলেন। কাপর বদলে বিছানায় বসে একটা সিগারেট বানালেন। ঘর টা বেশ ঠান্ডা, মনে হয় হিটার নেই। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে তার বেডের পাশেই তো হিটারের রেডিয়েটর। রেডিয়েটর ছুয়ে দেখলেন ঠান্ডা। তার মানে কাজ করছে না। যাক এ নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই। তেমন ঠান্ডা লাগছে না গায়ে তো থারমাল পাজামা আর থারমাল হাতা ওয়ালা গেঞ্জি রয়েছে। বালিশে হেলান দিয়ে সিগারেট টানতে টানতে আস্তে আস্তে একটা একটা করে সারা দিনের সব ছবি গুলি মাথায় এসে ভির করল। মনি কোথায়? ঘড়ির দিকে তাকাল। দেড়টা বাজে। মানে মনি এখন কুয়ালালামপুরে। ও কি ঠিক ঠাক মত চেক আউট করতে পেরেছে? হোটেলে যাওয়া এসব কি করতে পেরেছে? প্লেনে কি শাস কষ্ট হয়েছিল? কি করেছে তা হলে? না কিছুই হয়নি মনি ভালোই আছে এবং কুয়ালালামপুরে হোটেলে শুয়ে আছে। হা, তবে ঘুমুতে পারছেনা। যাক ও ভাল থাকুক ভাল ভাবে দেশে গিয়ে পৌছুক। একটু চা হলে ভাল হত। আবার নিচে গিয়ে কবিরকে বলল-
ভাই চায়ের ব্যাবস্থা আছে নাকি?
আসাদ বলল-
নিচে যান, লাইট জালতে পারবেন? নেমেই ডান দিকে সুইচ লাইটটা জ্বালিয়ে সামনে টেবিলের পাশে দেখবেন কেটলি আর পাতা দুধ চিনি এগুলি আছে। কেটলির নিচের সেলফের ভিতর কফিও আছে যা ইচ্ছা খেয়ে আসেন। আপনারা কেউ খাবেন?
এইতো একটু পরেই তো সেহেরি খাবো তখন একবারে খাবো।

তাহলে আমি এখন একটু খেয়ে আসি তখন না হয় আপনাদের সাথে আবার এক কাপ খাবো।
তা খাবেন। খাবার ব্যাপারে কোন নিষেধ নেই। যখন যা ইচ্ছা খাবেন তবে একটা কথা মনে রাখবেন এখানে সবাই কাজের জন্য বলবে কিন্তু কেউ আপনাকে খেতে বলবে না কাজেই সেটা নিজেকেই করতে হবে।
হা ঠিক বলেছেন এটাই স্বাভাবিক, ঘরের বাইরে এমনই হয় এতে কিছু মনে করার মত নেই।
আসাদ যে ভাবে বলে দিয়েছে সেভাবেই চা, কেটলি, কাপ সব পেয়ে কেটলিতে পানি দিয়ে সুইচ অন করে দিয়ে কিচেনটা আবার একটু চোখ মেলে দেখে নিলো। এর মধ্যে পানি ফুটে উঠলে কাপে ঢেলে লাইটটা নিভিয়ে চামচ দিয়ে নারতে নারতে উপরে নিয়ে এলো। সে ডায়াবেটিক রু… সুইট্যাক্সটা নিচে নিয়ে যায়নি। উপরে এসে ব্যাগ থেকে সুইট্যাক্স বের করে কাপে দিয়ে নেরে নিয়ে চামচ টা পিরিচে নামিয়ে রেখে একটা চুমুক দিতেই মনটা বেশ ভাল লাগল। হাতের কাপটা নিয়ে বাইরে থেকে শব্দ আসা জানালার পাশে দাঁড়াল। তখন দিনের বেলা যে পাব দেখেছিল সেই পাবের সামনে মহিলা পুরুষ মিলে দশ বারোজন। এর মদ্ধ্যে আবার কেউ ভিতরে যাচ্ছে কেউ বাইরে আসছে। এদেরই হৈ চৈ। পাবের ভিতর উচ্চ শব্দের বাজনাও শোনা যাচ্ছে। কাল পরষু ছুটি তাই আজ কাজের শেষে পানের উন্মাদনায় মেতে উঠেছে। এই জন্যই তাহলে এখানে শুক্র শনি বারে এতো ব্যাস্ত!
[আমাদের সৌভাগ্য যে আমরা একটি দেশ পেয়েছি। আসুন এই দেশের জন্য সবাই মিলে কিছু করি।]

No comments:

Post a Comment

Thank you very much for your comments.