Friday, 30 November 2012

নক্ষত্রের গোধূলি-২৯, [তৃতীয় অধ্যায়]

[পূর্ব সূত্রঃ কি সুবিধা?
না মানে আপনি তো ইংরেজি পরতে পারেন বলতে পারেন, ইংরেজি পরতে পারলে অনেক সুবিধা। চলেন উপরে চলেন ঠিক ঠাক করে নেন আবার কিন্তু পাচ টায় নামবেন দেখবেন ডাকাডাকি যেন করতে না হয়।]


আচ্ছা ঠিক আছে চলেন।
উপরে এসে সেই রুমে ঢুকে দেখে সবাই শুয়ে পরেছে।
কবির বলল-
আপনার মাল পত্র নিয়ে চলেন আমার সাথে।
লাগেজ দুটা তখন খুলতে হয়েছিল সেটা আবার বন্ধ করে নিয়ে কবিরের সাথে উপরে উঠে এলো। এখানে নিচের ওই মাপের আর একটা রুম তবে এটির অবস্থা ওই রকম নয়। প্রায় খালি আর ওই দুর্গন্ধটা নেই তবে ঘরটা ঠান্ডা মনে হলো। যাই হোক, এখানে দুইটা বিছানা। কবির বলল-
নেন এখানে এই বিছানা আপনার, ওই বেডে আমাদের এক ওয়েটার ভাই থাকে আপনি এখানে থাকবেন।
এই বলেই আচ্ছা পরে কথা হবে বলেই কবির চলে গেল। কবির চলে যাবার পর রাশেদ সাহেব চোখ ঘুরিয়ে ঘর টা দেখে জানালার কাছে দাড়ালো। বাইরেটা দেখা যাচ্ছে। যে রাস্তা দিয়ে সে এসেছে। রাস্তার ওপারে একটা লন্ড্রি, একটা পাব আর একটা রিয়েল এস্টেটের অফিস দেখল। কয়েকটা গাড়ি ডান থেকে বামে, কয়েকটা বাম থেকে ডানে চলে যেতে দেখল। না এভাবে দাড়িয়ে আমার তামাশা দেখার সময় নেই। ঘরের ভিতর একটা বড় গোল টেবিল আর একটা চেয়ার এই রয়েছে আসবাব। কোন আয়না নেই। ব্যগ খুলে হেয়ার ব্রাশ, তামাকের প্যকেট, লাই্টার, ক্রিম লোশনের টিউব বের করে টেবিলের উপর রেখেই মনে হলো সিগারেটের ছাই ফেলার কিছু দরকার। এদিক ওদিক তাকাতেই একটা এয়শট্রে পেয়ে টেবিলের উপর এনে রেখে দুএকটা প্যন্ট শার্ট রাখার জায়গা খুজে না পেয়ে আর কিছু বের করল না। শুধু বিছানার ময়লা চাদর, বালিশের কভার বদলে নিল। মনি দিয়ে গিয়েছিল একটা চাদর আর দুই টা বালিশের কভার তাই দিয়ে। এগুলি বদলে একটু বিছানায় বসেছে ওমনি নিচে থেকে ডাক এলো-
নয়া ভাইছাব নিচে আসেন ইফতারের টাইম হইছে।

রাশেদ বের হলো। কোথায় বাথরুম টয়লেট দেখা হয়নি। দেখা দরকার। একটু চাপ বোধ হচ্ছে। সারাদিনে তো আর মনে হয়নি। রুম থেকে বের হয়ে যে পথে উপরে উঠেছিল তার পাশ দিয়ে দেখে একটা প্যাসেজ। এগিয়ে যেতেই পেল। নাহ, আর যাই হোক অন্তত টয়লেটটা পরিষ্কার আছে। ওখানে কাজ সেরে নিচে নেমে কিচেনে কাউকে দেখল না কিন্তু পাশেই কোথাও কথার শব্দ পেয়ে বুঝল রেস্টুরেন্টের ভিতর হবে হয়ত। হ্য তাই, ওখানেই একটা বড় টেবিলে পাচ জন ইফতারের আয়োজন করছে।
আসেন ভাইছাব।
এগিয়ে গিয়ে বলল-
আমি কি করবো?
না আজকে কিছু করতে হবেনা আপনি বসেন।
টেবিলে পানির জগ, গ্লা্‌স, খেজুর, আপে্‌ল, বড় কাবলি ছোলা ভুনা আর কি যেন এক রকম পায়েশ এর মত মনে হলো। ঘড়ি দেখে একজন বলল টাইম হয়ে গেছে পানি মুখে দেন সবাই। ইফতারের ফাকে ফাকে সবার পরিচয়ের পর্ব শেষ হলো। কবিরের সাথে আগেই আলাপ হয়েছে। কবির কিচেনে কাজ করে, সে কুক। প্রধানত পেয়াজ রসুন আদা ছেলা- কাটা, এগুলির পেস্ট তৈরি করা, পোলাউ রান্না, মাংশ সবজি ডাল ইত্ত্যাদি কাস্টমারের পসন্দ মত তৈরির জন্য শেফ কে প্রস্তুত করে গুছিয়ে দেয়া এই হল তার কাজ। মারুফ তন্দুরে নান বানানো্‌, মুরগি ভেরার মাংশ, কিমা তন্দুরের আগুনে পুরিয়ে যে সব তৈরি করা হয় তাই করে। সে হল তন্দুরি শেফ। আর এক জনের নাম দেলওয়ার সে সেকেন্ড শেফ। শেফ সাহেব আজ নেই তার স্ত্রী হাসপাতালে সেজন্য তিন দিনের ছুটি। আগামি সোম বারে আসবে। রাশেদ সাহেব এতক্ষণে একটু স্থির হয়েছেন। যারা উপস্থিত আছে সবার সাথে কথা বার্তা বলে কার কি কাজ মোটামুটি জেনে নেয়ার চেস্টা করছে। আর সে নিজে হল কিচেন পোর্টার। তার কাজ পেয়াজ আলু ছেলা, যাবতিয় হারি পাতিল, কাস্টমারের প্লেট বাটি, অন্নান্য ডিশ ধুয়ে পানি ঝরিয়ে শুকিয়ে যায়গা মত রাখা। তবে গ্লাস ধুতে হয়না, ওগুলি ওয়েটাররাই ধুয়ে থাকে।

সরবরাহকারির দেয়া কিচেনের মালামাল উঠিয়ে গুছিয়ে রাখা। শেফ বা কিচেনের অন্নান্য কর্মচারির হুকুম তামিল করা মানে এটা ধুয়ে দিন, ওটা এনে দিন, স্টোর থেকে পিয়াজের বস্তা আলুর বস্তা নিয়ে আসেন, এই আবর্জনা গুলি উ্ঠিয়ে বিনে ফেলেন। বিনটা বাইরে কাউন্সিলের বিন বক্সে ফেলে আসেন। কিচেন ঝাড়ু দিয়ে মপ মেরে দেন। মপ মারা হলো লাঠির মাথায় লম্বা সুতার ব্রাশ দিয়ে বিষেশ ভাবে তৈরি বালতি ভরে গড়ম পানির সাথে সাবান ব্লিচ এবং এন্টি ব্যক্টেরিয়াল সুগন্ধি মিশিয়ে মেঝে ব্রাশ দিয়ে মুছে এনে বালতির উপরে চিপরানোর জায়গায় চিপরিয়ে আবার মুছে এনে বালতির ভিতর ধুয়ে চিপরিয়ে সমস্ত ঘর মুছে নেয়া। অবশ্য মাঝে মাঝে বেশি বিজি হলে সবাই সাহায্য করে। এরাই হল কিচেন স্টাফ। কোন কোন ক্ষেত্রে শেফ নিজেই মালিক বা অংশিদার। কিন্তু তা হলে হবে কি তাকেও সবার মত একই কাজ করতে হয় কারন সেও সবার মত বেতন নেয়।
ওদিকে সামনে যারা কাজ করে তারা হল ওয়েটার। এখানে তিনজন অংশিদার। একজন হলো শেফ, অপর দুই জন সামনে কাজ করে। শিক্ষানবিশ ওয়েটার হল কুমি ওয়েটার। এ ছারা আরো আছে মিড ওয়েটার এবং ওয়েটার। নুরুল ইসলাম, রেস্টুরেন্টে ঢুকেই যাকে দেখেছিল সে কুমি ওয়েটার। সে রাশেদ সাহেবের সাথে এক রুমে থাকে। দুপুরে কাজ শেষে কোথায় যেন গিয়েছিল যার জন্য রুমে দেখতে পায়নি । কাস্টমারের অর্ডারে পাপর থাকলে পাপর এবং তার সাথে চাটনি পরিবেশন করে। খাবার পর হট টাওয়েল এনে দেয়, সাথে একটা ডেসার্ট মেনু আর মৌরি জাতিয় কিছু। টেবিল পরিষ্কার করে, বার থেকে ট্রে করে মদের গ্লাশ এনে দেয়, ওয়েটার কাস্টমারকে অভ্যর্থনা জানাবার পর কুমি ওয়েটারকে বলে দেয় একে অত নম্বর টেবিলে বসতে দাও। তাকে এনে সেই অনুযায়ি বসিয়ে দিয়ে খাবার মেনু দিয়ে যায়। যত জন কাস্টমার তত টা মেনু। আবার কাস্টমার যাবার সময় তার কোট বা জ্যাকেট থাকলে যা কিনা ঢোকার সময় খুলে হুকে ঝুলিয়ে রেখেছিল সেটি এগিয়ে গায়ে দিয়ে দিতে হবে। সদর দরজা খুলে পাশে দাড়িয়ে গুড নাইট স্যার/ম্যাডাম, আবার আসবেন বলে বিদায় জানাতে হবে। ওয়েটার বা মিড ওয়েটা রদের মধ্যে কেউ একজন বারে থকে, সে মদের ধরন অনুযায়ি গ্লাসে মদ ঢেলে দেয়। আবার এরাই কেউ কাস্টমার টেবিলে বসার পর অর্ডার বই নিয়ে এসে জানতে চায় তোমরা কি অর্ডার দেয়ার জন্য প্রস্তুত? যদি বলে হা, তখন তাদের দেয়া অর্ডার লিখে একটা কপি কুমি ওয়েটার এর হাতে দিয়ে দেয় তাতে টেবিল নম্বর থাকে। সে ওটা নিয়ে কিচেনে দিয়ে আসে আর একটা কপি বার এর কাউন্টারে দেয়। বারে যে থাকে সে হিসাব নিকাশ এর কাজও করে।

কখনো কাস্টমার অচেনা মেনু দেখে চিনতে পারে না তখন জানতে চায় এটা কি? হ্য হ্য এইটা কি? ওয়েটার ব্যাক্ষা করে বলে দেয় এটা এই, ওটা এই, এটায় ঝাল বেশি, ওটায় ঝাল কম। এটা এইভাবে তৈরি, ওটা ওইভাবে। যতটা সম্ভব মনরঞ্জন করে একটা ভাল দামি অর্ডার আদায় করা। কোন কোন কাস্টমার আবার বলে-
দেখ আমার বাদাম বা দুগ্ধজাত খাবারে এলার্জি আছে তা আমি কোন অর্ডার দিতে পারি? তাকে সেরকম মেনু দেখিয়ে দিতে হয়। আসাদ হোসেন হলো ওয়েটার। সে এদেশে সিএ পরতে এসেছে। তার বাড়ি ময়মনসিংহ এছাড়া আর সবাই সিলেটের। ইফতার কি হল না হল সে্ দিকে খেয়াল করার মত সময় নেই। কোন রকম পেটে ঢোকান। মোটামুটি ইফতার আর পরিচয় পর্ব সেরে আবার উপরে উঠে এলো সবাই। এর মধ্যেই প্রায় পৌনে পাচ টা বেজে গেছে। আবার পাচ টায় নামতে হবে।
নিজের বিছানায় এসে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে বসে ভাবল মনি ফ্লাই করেছে কথাটা ঢাকায় বাসায় জানানো দরকার কিন্তু কিভাবে জানাবে? অবশ্য মনিকে বলে দিয়েছে সে ঢাকা এয়ারপোর্টে নেমে আনুষ্ঠানিকতা সেরে বাইরে এসে বাসায় ফোন করবে। তবে কায়সার বেয়াই যদি সাথে এসে অন্তত কল্যাণপুর পর্যন্ত দিয়ে গেলেও হবে তবে তা সে করবে কিনা কে জানে। সে ভরসায় থাকা যায়না। তাছাড়া আগে থেকে বাসায় জানা থাকা আর ফোন পেয়ে যাওয়া তো এক কথা নয়। সামনে বসা নুরুল ইসলামকে বলল-
ভাই, কি ভাবে একটা ফোন করা যাবে?
নুরুল ইসলাম বলল-
আপনার কাছে ফোন কার্ড আছে?
হা আছে।
তাহলে ওই টয়লেটে যাবার পথে দেখেন একটা ফোন আছে ওইটা দিয়ে করতে পারবেন তারাতারি করেন ডিউটিতে যাবার সময় হয়ে গেছে।
কথাটা শুনেই তারাতারি যেতেই দেখে হ্যা একটা ফোন আছে। সঙ্গে সঙ্গে নম্বর মেলাতেই ওপাশে রিং হবার শব্দ শুনতে পেল। ফোন ধরল ছোট মেয়ে- আব্বু! তুমি কেমন আছ?
হ্যা আব্বু আমি ভাল আছি, শোন তোমার মা কাল সন্ধায় ঢাকা নামছে সে এখান থেকে আজ সকালে ফ্লাই করেছে।
তুমি কোথায় আব্বু? আমি এইতো অক্সফোর্ডে একটা রেস্টুরেন্টে কাজ নিয়ে এসেছি আজ দুপুরে, তোমরা ভাল আছ তো আব্বু?
হ্যা আব্বু আমরা ভাল আছি।
আচ্ছা আব্বু আজ সময় নেই, এইতো এখনি কাজে যেতে হবে সময় মত আমি কাল আবার ফোন করব। তোমার মা পৌছল কিনা শুনব আজ তাহলে রাখি আব্বু তোমরা সাবধানে থেক।

ফোনটা শেষ হতেই দেখে আর সময় নেই রুমে না ঢুকে সরাসরি নিচে নেমে এল।
কবির ভাই বলেন কি করতে হবে।
আসেন আমার সাথে
কিচেনের পাশের রুমে যেখানে আর একটা বড় শুকনো মালামালের স্টোর ওখানে বিরাট দুটা ফ্রিজ খুলে বলল-
এই যে এই গুলি বের করে নিয়ে আসেন আমার সাথে।
বিভিন্ন সাইজের ট্রে বড় বড় বাটিতে নানান রকমের জিনিষ। এতে আছে আলাদা আলাদা রকমের মশলা দিয়ে সেদ্ধ করা দুই তিন পদের মুরগির মাংশ, ভেরার মাংশ, কোনটা লাল কোনটা হলদেটে কোনটা সাদা। আরো আছে ওই রকম সবজী, আলু,, নানা ভাবে কুচানো পিঁয়াজের তিন চার পদ, আদা রসুনের পেস্ট, টক দই, টমাটো আর কি কি সব মশলা দিয়ে বানানো কি কি যেন চিনতে পারল না।
কাটা টমাটো, শশা, লেবু, লেটূস, সেদ্ধ করা নানা সাইজের পিয়াজ, কাচা মরিচ, ধনে পাতা ইত্যাদি। আবার এর সাথে হলুদ, ধনিয়া, শুকনা মরিচ, জিরার গুরা, শুকনা মেথি পাতা, কুরানো শুকনা নারকেল, লবন, চিনি, কিসমিস, আলমন্ড বাদামের গুরা, পেস্তা বাদাম এবং আরও কিছু যা চিনতে পারল না এগুলি নিয়ে কিছু শেফ এর পিছনে, কিছু পাশে সাজিয়ে রাখল।

কবির বলল-
প্রতিদিন এই ভাবে এসে সব কিছু যেটা যেখানে আজকে রাখলেন সেই ভাবে রাখবেন। আবার বনধ হবার আগে যখন শেফ সাহেব বলবে তখন যেখান থেকে যেভাবে এনেছেন সেই ভাবে নিয়ে রাখবেন।
যারা রেস্টুরেন্টে বসে না খেয়ে প্যাকেটে করে নিয়ে যায় তাদের জন্য আগে থেকে সাদা ভাত, পোলাউ এসব প্যাকেটে ভরে হট বক্সের ভিতরে রেখে দিতে হবে। যাতে করে তারাহুরোর সময় হই চই না লাগে। পচিশ টা পোলাউ এবং চল্লিশ টা সাদা রাইস এভাবে ভরে রাখল।
আজকে মারুফই শেফ এর কাজ এবং তার নিজের কাজ সহ চালিয়ে যাবে। ঘরিতে দেখল সারে পাচটা বেজে গেছে। কিছুক্ষণের মদ্ধেই প্রথম অর্ডার এলো। কুমি ওয়েটার নুরুল ইসলাম অর্ডার পত্র টা এনে শেফ এর পিছনে একটু উচুতে একটা লম্বা কাঠের ফ্রেমের সাথে আটকিয়ে দিয়ে চলে গেল। শুরু হলো শেফ সাহেবের রান্না। ছোট ফ্রাই প্যান চুলায় চাপিয়ে তাতে একটু তেল দিয়ে কুচানো পিয়াজ আর কিছু মশলা দিয়ে নারা চারা করে তার মধ্যে পাশে রাখা ওই যা ডেকচিতে কি যেন জাল দিতে দেখেছিল তার থেকে চামচ দিয়ে উঠিয়ে ডালের মত কি যেন দিল সেটা ফুটতে আরম্ভ করেছে পিছনে রাখা মাংশের ট্রে থকে গুনে গুনে কয়েক টুকরা মাংশ ছেরে দিয়ে নারা চারা করে নামিয়ে যে ধরনের অ্যালুমিনিয়ামের ছোট প্যাকেটে ভাত ভরেছিল তার চেয়ে একটু বড় প্যাকেটে ভরে ফ্রাই প্যান টা সিঙ্কের মধ্যে ছেরে দিয়ে রাশেদ সাহেবকে বলল-
ভাইছাব এটায় ঢাকনা লাগিয়ে নাম লিখে দেন, তারপর প্যানটা ধুয়ে দিবেন।

কি নাম লিখব?
লেখেন চিকেন ভিন্দালু।
এর পর উনি আবার আরও দুইটা প্যান একত্রে উনুনে চাপিয়ে দিলেন। এবার কি করলেন তা আর দেখা গেল না। ওই প্যান ধোয়ার কাজে লেগে গেলেন। কিছুক্ষন পর আবার বললেন এটা চিকেন টিক্কা মাসালা আর এটা ল্যাম্ব কোরমা, এগুলি যখন নিতে আসবে এর সাথে দুইটা বয়েল রাইস আর একটা প্লেইন নান দিয়ে দিবেন। নানটা আমি দিচ্ছি, এই যে এই ব্যাগে ভরে দিয়ে দিবেন। আর আপনে এই যে এই বিল এইটা দেখে নিবেন তাই বুঝতে পারবেন কোন অর্ডারে কি আছে এটা খেয়াল করে ব্যাগে ভরে দিবেন। দেখবেন ভুল যেন না হয় ভুল হলে কিন্তু কাস্টমার ফিরে আসবে এবং তা আমাদের গুড উইল নষ্ট করবে। আমি তো চিল্লাই না। দেখবেন শেফ আসলে কি করে। তার চিল্লা নিতে কিচেনে থাকা মুশকিল।
রাশেদ সাহেব আবার ওই দুই প্যাকেটে ঢাকনা লাগিয়ে নাম লিখে নিচের হট বক্সের ভিতর রাখে দিল। আবার ওই দুই প্যান সিঙ্কে জমা হয়েছিল এখন তা ধুয়ে দিল। এবারে মারুফ বলল-
ভাইছাব এই যে প্যান ধুইতেছেন দেখবেন যেন এই হ্যান্ডেলের ভিতর পানি না থাকে তা হলে হ্যান্ডেল গরম হয়ে যায় আর তা ধরা যায়না।
বেশ।
এর মধ্যেই ফ্রাই প্যান ধোয়ার সময় তারের জালি দিয়ে ডলতে গিয়ে হাতে দুএক যায়গায় কেটে গেল কিছু বুঝে উঠার আগেই।
একটু পরেই আর একটা অর্ডার। এটা দেখে মনে হল বেশ বড় অর্ডার। হা বেশ বড়ই বটে। মারুফ আবার তার কাজে লেগে গেল। কবির বলল-
এইযে নয়া ভাইছাব আমাকে একটু পোলাউ রাইস গড়ম করে দেন, ওই যে মাইক্রোওয়েভ ওইটাতে দুই মিনিট গড়ম করলেই হবে।
সাথে সাথে দেলোয়ার বলে উঠলো ঢাকাইয়া ভাইছাব আমারে একটা স্যালাদের প্লেট দিবেননি?
রাশেদ এক এক করে ওগুলি দিয়ে দিল। ওদিকে আবার সিঙ্কে মারুফের দেয়া ফ্রাই প্যান জমে গেছে । ওতে হাত দিতে যাবে এমন সময় সামনে থেকে আসাদ এসে বলল রাশেদ ভাই আমাকে চারটা স্টার্টার প্লেট রেডি করে দিবেন।

এটা আবার কি?
কবির বলল-
আচ্ছা আমি দেখিয়ে দিব ভাববেন না।
মারুফ বলে উঠল ভাইসাব দুইটা প্রন ককটেল গ্লাশ লাগান।
হিমশিম অবস্থা।

মারুফকে দেখেছিল যে ডিশ গুলি রান্না করে পেয়ালায় ঢেলে হট বক্সের ভিতর রেখে দিতে। এখন দেখল সামনে থেকে আসাদ একটা ট্রলি নিয়ে এসে তাতে ওই সব পেয়ালা, কয়েকটা প্লেইন রাইসের পেয়ালা দুইটা পোলাউ রাইসের পেয়ালা, বড় একটা প্লেটে দুইটা নান রুটি নিয়ে গেল। এর মধ্যে দেলোয়ার কয়েকটা মুরগির টুকরা টমাটো আর ক্যাপ্সিকাম সহ শিকে গেথে গন গন করে গ্যাসের আগুনে জলা তন্দুরের ভিতর ঝলসাতে দিয়েছিল সেটা উঠিয়ে ছোট একটা লোহার ট্রেতে যেটা আগে থেকে চুলার উপর গরম হতে দিয়েছিল সেটায় কিছু কুচানো পিয়াজ ছেড়ে তার মধ্যে ঢেলে দিতে ছর ছর করে সব্দ আর ধোয়ার সাথে জিবে জল আসা সুন্দর গন্ধ ছড়িয়ে গেল। আসাদ আবার এসে একটা কাপরের ন্যাপকিন দিয়ে ধরে ওটা নিয়ে গেল। ওদের কথায় জানতে পেল এর নাম চিকেন শাসলিক। রাশেদ বুঝল ভিতরে কাস্টমার এসেছে যাদের জন্য এগুলি যাচ্ছে। একটু পরেই নুরুল ইসলাম এসে বলল-
ভাইছাব একটা পোলাউ রাইস দেন তো।
এইভাবে প্রায় দুই ঘন্টা চলে গেল কঠিন ব্যাস্ততার মধ্যে। সময়ের সাথে ক্ষুধায় রাশেদ অস্থির হয়ে গেল। কি করে, এখন লজ্জায় কাউকে কিছু বলতেও পারছেনা। সবাই ব্যাস্ত।
না, আর থাকা যায়না । দেয়াল ঘরিতে দেখল দশটা বাজে। এবার যে করেই হোক কবিরের কানে কানে বলল। কবির বলল-
হা আমাদেরওতো খুধা পেয়েছে একটু অপেক্ষা করেন সবার জন্যই বানাবো।
এতো ক্ষণ কি ভাবে যে সময় কেটে গেল টের পায়নি শুধু লক্ষ করল হাতের বেশ কত গুলো কাটা যা এখন জ্বলছে। একে একে সামনে থেকে প্লেট পেয়ালা এসেছে সেগুলি রাখার জায়গা কবির দেখিয়ে দিয়েছে। প্লেটের উচ্ছিষ্ঠ গুলি এই বিনে ফেলে এই যে দুই টা সিংক এর এইটা ধোয়ার জন্ন আর এই সিঙ্কের ভিতর প্লেট, হাফ প্লেট, কোয়ার্টার প্লেট, ছোট পেয়ালা, বড় পেয়েলা সুন্দর করে স্ট্যাক করে রেখে দেন। যখন সব আসা শেষ হবে তখন সব এক সাথে ধুয়ে ফেলবেন। অবশ্য যদি মাঝে কোনোটার টান পরে তখন এখান থেকে ধুয়ে দিতে হবে।

কবির কিছু পোলাও রাইস আর ওই যে সেদ্ধ করা সবজি ছিল ওগুলি দিয়ে সাথে কিছু মশলা টশলা দিয়ে নারাচারা করে একটা কি যেন বানিয়ে আট দশটা বাটিতে বেরে সবাইকে বলল খেয়ে নিতে। সামনে থেকে সবাই একে একে এসে খেয়ে গেল। আসাদ একটু পরে একটা ট্রে করে লেবু আর বরফের টুকরো দিয়ে কোক নিয়ে এলো চার গ্লাস। রাশেদের সামনে এসে বলল-
নেন ভাই আপনি নতুন এসেছেন আপনি আগে নিন।
রাশেদ একটা গ্লাশ তুলে নিল। রাশেদের গলায় টন্সিল, বরফ এড়িয়ে চলে তবুও প্রথম বার কোন আপত্তি করল না। গ্লাসটা পাশে রেখে কবিরের দেয়া নাম না জানা বিলাতের প্রথম ডিশ টা তুলে নিয়ে চামচ দিয়ে খেতে আরমভ করল। কাজ চলছে কাজেই নিশ্চিন্তায় খাবার উপায় নেই। তারাতারি খেয়ে গ্লাসটা এক চুমুকে শেষ করে মনে হল শরীর টা একটু স্থির হল। এই রকম হাকা হাকি ছুটা ছুটি ব্যস্ততার মধ্যে এক সময় খেতে আসা লোকজনের ভির ধীরে ধীরে কমে এলো। রাত এগারো টা বাজল। এবার সব কিছু গুছিয়ে নেবার পালা। বারোটায় রেস্টুরেন্ট বন্ধ। সামনে থেকে আনোয়ার এসে বলল-
মারুফ, কাস্টমার শেষ। আজকে আর ব্যাবসা হবেনা আটাইয়া লউ বারি যাই।
এবার মারুফ কবির কে ডেকে বলল-
নয়া ভাইছাবকে হেল্প কর।
আচ্ছা ঠিক আছে, আসেন ভাইছাব।
শুরু হল আর এক অধ্যায়।
[যে দেশ আলো, মাটি জল দিয়ে আমাদের লালন করেছে তার কাছে কিছু ঋণ থাকে আসুন সেই ঋণ কিছু শোধ করে যাই।]

No comments:

Post a Comment

Thank you very much for your comments.